সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: অস্তিত্ব সংকটে দেশের ৮ শতাধিক রপ্তানিকারক

নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে অশনিসংকেত নেমে এসেছে। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে দেশের আট শতাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যাদের ব্যবসার একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর। আগামী ১ আগস্ট থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হলে দেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ পর্যন্ত সকলের চোখ এখন সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ২ হাজার ৩৭৭টি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৮০১টি প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশেরও বেশি গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৬৮টি তৈরি পোশাক কারখানাসহ মোট ৩৪৪টি প্রতিষ্ঠান তাদের শতভাগ পণ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই রপ্তানি করে। নতুন এই শুল্ক কার্যকর হলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকেরা।

সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে শুধু তৈরি পোশাকের পরিমাণই প্রায় ৭৫৯ কোটি ডলার। এই বিশাল বাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চরম দুশ্চিন্তায়।

রপ্তানিকারকদের হাহাকার ও ক্রেতাদের উদ্বেগ

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ফরচুন অ্যাপারেলস তাদের শতভাগ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, “প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পণ্যের ওপর আগে থেকেই ১০-১৫ শতাংশ বেশি শুল্ক দিতে হয়। তার ওপর নতুন করে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে আমাদের টিকে থাকার কোনো সুযোগই থাকবে না। বিষয়টি নিয়ে আমাদের বিদেশি ক্রেতারাও উদ্বিগ্ন এবং তারা এর সমাধান না হলে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে।”

একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানালেন ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব, যার প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির ৮৯ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি বলেন, “প্রায় তিন দশক ধরে আমরা ওয়ালমার্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ক্রেতাদের সঙ্গে আস্থা ও সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছি। এখন যদি আগের ১৫ শতাংশের সঙ্গে বাড়তি ৩৫ শতাংশ, অর্থাৎ মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, তাহলে ক্রেতাদের পক্ষে আমাদের কাছ থেকে পোশাক কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা এখন ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছি।”

বিকল্প বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান মনে করেন, এই সংকটের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে সবাই বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশের রপ্তানিকারকেরাই তখন ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারে প্রতিযোগিতায় নামবে। এতে এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।”

তৈরি পোশাক ছাড়াও জুতা, টুপি, ব্যাগ, আসবাব এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। কর্ণফুলী উপজেলার মাসুদ অ্যাগ্রো প্রসেসিং ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, “তিন মাস আগে যখন প্রথমবার শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখনই ক্রেতারা রপ্তানি স্থগিত রাখতে বলেছিল। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় সেই দুশ্চিন্তা আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।”

দর-কষাকষিতেই সমাধানের আশা

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, এই পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় হুমকি। তবে তারা মনে করেন, কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর দর-কষাকষির মাধ্যমে যদি এই বাড়তি শুল্কহার প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়, তবেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য এই রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পাঠকপ্রিয়