প্রায় ২০ মাস গুম থাকার পর ফিরে এসেছেন মুফতি যায়েদুর রহমান। কিন্তু মুক্তি মেলেনি। এখন তাকে প্রতি মাসেই হাজিরা দিতে হয় বগুড়ার আদালতে—এমন এক শহরে, গুম হওয়ার আগে যেখানে তিনি জীবনে কখনও যাননি। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, বিস্ফোরক ও অস্ত্র আইনে মামলা চলমান। যায়েদুর রহমান একা নন; বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার হয়ে যারা ‘আয়নাঘর’ থেকে ফিরেছেন, তাদের বেশিরভাগই এখন মামলার জালে বন্দি। কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি মিললেও হয়রানিমূলক মামলার ভারে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একদিকে জীবিকার সংগ্রাম, অন্যদিকে অপরাধীদের ক্রমাগত হুমকি—সব মিলিয়ে এক দুঃসহ জীবন পার করছেন তারা।
গুম থেকে ফিরে মামলার খাঁচায়
কুমিল্লার দেবিদ্বারের মুফতি যায়েদুর রহমান ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে পুলিশ পরিচয়ে অপহৃত হন। প্রায় ২০ মাস পর ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর তাকে বগুড়ায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি বলেন, “গুম হওয়ার আগে আমার নামে কোনো মামলা ছিল না। এখন প্রতি মাসে বগুড়ায় হাজিরা দিতে হয়। হয়রানির কারণে কেউ চাকরি দিতে চায় না। এখনও বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকার প্রলোভন ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কারণ, গুমের সঙ্গে জড়িতরা নিজ পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।”
রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা গুমের যে ২৫৩ জনের তালিকা ‘গুম কমিশন’ তৈরি করেছে, তাতে যায়েদুরের নাম রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের গুমের তালিকায়ও তার নাম ৫৮ নম্বরে।
একই ধরনের বিভীষিকার শিকার চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাইরুল ইসলাম। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে র্যাব পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দুই মাস ২০ দিন পর ছেড়ে দেওয়া হলেও তার নামে দেওয়া হয় একটি অস্ত্র মামলা। সেই মামলায় ২০২৪ সালের জুনে তার যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়। এর পর থেকেই তিনি ফেরারি। সাইরুল বলেন, “সাজা মাথায় নিয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি। পুলিশ প্রায়ই বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করে। সরকার বা কোনো কমিশন থেকে সাহায্য পাচ্ছি না।”
জাতিসংঘের উদ্বেগ: সম্মানটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে
গুম থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ (ডব্লিউজিইআইডি)। গত জুনে বাংলাদেশ সফর শেষে দেওয়া সুপারিশে তারা বলেছে, মুক্তি পাওয়ার পরও ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্যায়ভাবে একাধিক ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এর ফলে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ক্রমাগত এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে হচ্ছে, যা তাদের কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
গুম থেকে বেঁচে যাওয়া একজন ডব্লিউজিইআইডি-কে বলেন, “তারা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, এমনকি আমাদের সম্মানও।”
বিচার চাইবেন কার কাছে? অপরাধীরাই যে ক্ষমতার কেন্দ্রে
বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গুমের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন। জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকে তারা জানিয়েছেন, এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো—যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, সেই অপরাধীদের অনেকেই এখনও পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, যেখানে তারা সাক্ষ্য দিতে যাবেন, সেখানেও অভিযুক্তরা উপস্থিত থাকতে পারে, যা সাক্ষ্য দেওয়াকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জন্য একটি নিশ্চিত সুরক্ষা কাঠামো ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ‘অত্যন্ত কঠিন এবং বিপজ্জনক’ হবে বলে মনে করে জাতিসংঘ।
সরকারের ভিন্ন সুর ও ভুক্তভোগীদের অনাস্থা
গুম থেকে ফেরা ব্যক্তিদের এই হয়রানি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলছেন, তারা ইতোমধ্যে ১৫-১৬ হাজার মামলা প্রত্যাহার করেছেন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট মামলার নম্বর পেলে সেগুলোও সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাহার করা হবে।
তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেকেই উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িত, ফলে চাইলেই সব মামলা উঠিয়ে নেওয়া যায় না। তার মতে, মানবিক দৃষ্টিকোণের পাশাপাশি নিরাপত্তার ঝুঁকিও মাথায় রেখে মামলাগুলো সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কিছু করছে না। প্রান্তিক পর্যায়ের গুম থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা চরম দুর্গতির মধ্যে রয়েছেন। জামিন না পেয়ে অনেকে এখনও এলাকাছাড়া। ফলে বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে।”
সব মিলিয়ে, গুম থেকে ফিরে আসা মানুষগুলো এক নতুন ধরনের কারাগারে বন্দি। একদিকে মিথ্যা মামলার বোঝা, অন্যদিকে অপরাধীদের ভয়—এই দুইয়ের যাঁতাকলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা এবং কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এই মানুষদের মুক্তি অধরাই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।