যেখানে প্রকৃতি তার সবটুকু সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে, সেই রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বুকেই এখন গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত কংক্রিটের জঙ্গল। গত এক দশকে হ্রদ ও কর্ণফুলী নদীর পাড় ঘেঁষে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অন্তত ২০টি রিসোর্ট, যার একটিরও নেই জেলা প্রশাসন থেকে নেওয়া লাইসেন্স। পরিবেশ অধিদপ্তর বা ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই ‘খেয়ালখুশি’মতো গড়ে ওঠা এসব অবকাশকেন্দ্র এখন কাপ্তাই হ্রদের জীববৈচিত্র্য, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য এক ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই কারো
দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাইকে ঘিরে এই পর্যটন বাণিজ্যের প্রসারে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়ম। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যটন তাদের অধিভুক্ত হলেও পরিষদকে না জানিয়েই চলছে বেশিরভাগ নির্মাণকাজ। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা ফায়ার সার্ভিস—কোনো দপ্তরের কাছেই গড়ে ওঠা সব রিসোর্টের সুনির্দিষ্ট তালিকা পর্যন্ত নেই।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা কোনো রিসোর্টই লাইসেন্স নেয়নি, কারণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তারা দিতে পারবে না। অন্যদিকে, রিসোর্ট মালিকদের দাবি, পাহাড়ে ব্যবসা করা কঠিন এবং অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তাই এসবের প্রতি তাদের আগ্রহ কম। এই প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগেই কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট সাম্রাজ্য।
পরিবেশের বুকে গভীর ক্ষত
এই ২০টি রিসোর্টের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র তিনটি—পলওয়েল পার্ক অ্যান্ড কটেজ, প্যানোরমা জুম রেস্তোরাঁ ও নিসর্গ পড হাউস। বাকিরা পরিবেশ আইনকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
বেশির ভাগ রিসোর্ট শুধু ছাড়পত্র না নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে ও নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণেরও অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে ইতোমধ্যে কাপ্তাইয়ের তিনটি নির্মাণাধীন রিসোর্টকে নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সরেজমিনে গিয়েও দেখা গেছে পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র। রাঙামাটির আসামবস্তি সড়কের বরগাং রিসোর্টের আবর্জনা সরাসরি ফেলা হচ্ছে পাশের খাদে, যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বেড়াইন্ন্যে রিসোর্টেও গর্ত করে প্লাস্টিকসহ সব ধরনের ময়লা ফেলে রাখা হয়েছে।
রাঙা দ্বীপ রিসোর্টের অন্যতম উদ্যোক্তা আলোক ব্রত চাকমা বলেন, তারা পরিবেশদূষণ করছেন না এবং বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলেন। তবে অন্য কেউ পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে বলে তার জানা নেই।
অগ্নিকাণ্ড ও পাহাড়ধসের বড় শঙ্কা
পরিবেশের পাশাপাশি চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টিও। গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলোর মধ্যে মাত্র সাতটি ফায়ার সার্ভিসের সনদ নিয়েছে। কিন্তু সনদ নিলেও শর্ত মানার প্রবণতা কম। ৯ জুলাই পাঁচটি রিসোর্ট ঘুরে প্রতিটি কটেজের সামনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দেখা যায়নি।
রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তনয় দেওয়ানের যুক্তি আরও অদ্ভুত। তিনি বলেন, “আমাদের রিসোর্টগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে টাকা খরচ করে কেন সনদ নেব?”
বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে ‘ভয়ংকর’ বলে অভিহিত করছেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, “পাহাড়ে ট্যুরিজমের নামে পরিবেশবিধ্বংসী কাজ চলছে। যেভাবে খেয়ালখুশিমতো রিসোর্ট গড়ে উঠছে, তাতে পাহাড়ধস ও অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।”