সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

২৫০ ফুট উঁচু জলপ্রপাত: রাঙামাটির গহীনে লুকিয়ে থাকা রূপের রানি

রাঙামাটির নতুন বিস্ময় সাগরবান্ধা: এক যাত্রায় আট ঝরনার হাতছানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জল কেটে যখন আপনার ইঞ্জিন নৌকাটি সুবলংয়ের পরিচিত পথ ছেড়ে বাঁ দিকের এক অচেনা চ্যানেলে প্রবেশ করবে, তখন থেকেই শুরু হবে এক অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চার। গন্তব্য রাঙামাটির গহীনে লুকিয়ে থাকা এক আশ্চর্য জলপ্রপাত—সাগরবান্ধা। তবে গল্পটা শুধু একটি ঝরনাকে ঘিরে নয়, বরং এটি এক যাত্রায় অন্তত আটটি ভিন্ন ভিন্ন ঝরনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক শিহরণজাগানো আখ্যান।

বর্ষার জলে টইটম্বুর রাঙামাটি এখন যেন তার সবটুকু রূপ উজাড় করে দিয়েছে। আর সেই রূপের অন্যতম সেরা প্রদর্শনী চলছে সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা ইউনিয়নের চারিহং গ্রামে। এখানেই প্রায় আড়াই শ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে সাগরবান্ধা ঝরনার রূপালি জলের ধারা। চারপাশে সবুজের নিশ্ছিদ্র দেয়াল, ঠান্ডা জলীয় বাষ্পের কুয়াশা আর ঝরনার গর্জন—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ, যা মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় শহরের সব ক্লান্তি।

রোমাঞ্চকর সেই ছড়ার পথ

রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার নৌ-ভ্রমণ শেষে আপনি পৌঁছাবেন চারিহং গ্রামে। নৌকা থেকে নামার আগেই দূর থেকে স্বাগত জানাবে সাগরবান্ধাছড়ার প্রথম ঝরনাটি, যার জলধারা সরাসরি মিশে যাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদের বুকে। মূলত এখান থেকেই আপনার পদযাত্রার শুরু।

এরপরের পথটুকু যেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গ। আপনাকে হেঁটে যেতে হবে পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরিপথ ধরে। বর্ষার জলে পূর্ণ ছড়ার স্বচ্ছ পানির নিচে শেওলা জমা পিচ্ছিল পাথর। এখানে প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। হিমশীতল পানিতে পা ডুবিয়ে, কখনো কোমর সমান পানি ভেঙে, পাথুরে উপত্যকা বেয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি মুহূর্তই এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই পথেই আপনার দু’পাশে একের পর এক দেখা দেবে ছোট-বড় আরও অন্তত সাতটি নয়নাভিরাম ঝরনা। প্রতিটি বাঁকেই যেন প্রকৃতি তার নতুন কোনো বিস্ময় সাজিয়ে রেখেছে।

অবশেষে ২৫০ ফুটের জলধারা

কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি এক নিমিষেই উধাও হয়ে যাবে, যখন আপনি মূল সাগরবান্ধা ঝরনার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন। প্রায় ২৫০ ফুট উঁচু থেকে বিপুল জলরাশি যখন সশব্দে নিচের পাথরে আছড়ে পড়ে, তখন যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ঠান্ডা পানির কণাগুলো বাতাসে উড়ে এসে আপনাকে ভিজিয়ে দেবে, আর সেই অনুভূতি আপনাকে এনে দেবে পরম শান্তি।

গত শুক্রবার রাঙামাটি থেকে ঘুরতে আসা একটি দলের সদস্য বাবলু চাকমা তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “সাগরবান্ধাছড়ায় গেলে একসঙ্গে অন্তত ৭-৮টি ঝরনা দেখা যায়। তবে মূল সাগরবান্ধা ঝরনাটি একেবারে অন্যরকম। খুব সুন্দর এই ঝরনায় একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে করে।” তাঁর কথার সত্যতা মেলে সেখানে উপস্থিত অন্য পর্যটকদের উচ্ছ্বাসেও।

সৌন্দর্যের গভীরে আবর্জনার আঁচড়

প্রচারণার আলো এখনো সেভাবে না পড়ায় সাগরবান্ধা এখনো অনেকটাই নির্জন। তবে ধীরে ধীরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে, বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে। আর এর সাথেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন উদ্বেগ। চারিহং গ্রামের বাসিন্দা শান্ত চাকমা বলেন, “সাগরবান্ধাছড়ার খবর শুনে এখন প্রায়ই পর্যটকেরা আসছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তাদের অনেকে পলিথিন, চিপসের প্যাকেটসহ নানা বর্জ্য এই সুন্দর ছড়ায় ফেলে যান।” প্রকৃতির এই অমূল্য দানকে রক্ষা করতে পর্যটকদের আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বন্দুকভাঙা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বরুণ কান্তি চাকমাও স্বীকার করেন, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, যেমন- বসার জায়গা বা শৌচাগার, এখনো সেখানে নিশ্চিত করা যায়নি।

আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা

কীভাবে যাবেন: ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসে সরাসরি রাঙামাটি শহরে পৌঁছাতে হবে। শহরের যেকোনো ঘাট (যেমন: পর্যটন ঘাট বা রিজার্ভ বাজার) থেকে সুবলং যাওয়ার ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করতে হবে। চালককে আগে থেকেই চারিহং গ্রামের সাগরবান্ধা ঝরনায় যাওয়ার কথা বলতে হবে। নৌকার আকার ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী আসা-যাওয়ার জন্য ভাড়া পড়বে দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকা।

কোথায় থাকবেন: রাঙামাটি শহরে পর্যটন মোটেল, হোটেল মতিমহল, হোটেল নাদিয়া, হোটেল প্রিন্সসহ বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। ভাড়া পড়বে ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া কাপ্তাই হ্রদের বুকে গড়ে ওঠা রাঙাদ্বীপ রিসোর্ট বা বার্গী রিসোর্টের মতো অসংখ্য কটেজেও থাকতে পারেন।

বিশেষ সতর্কতা:

* চারিহং গ্রামে পর্যটকদের জন্য কোনো খাবারের দোকান নেই। তাই শহর থেকে সারা দিনের জন্য শুকনো খাবার ও পর্যাপ্ত পানি নিয়ে যাওয়া আবশ্যক।

* ঝিরিপথ খুব পিচ্ছিল হওয়ায় হাঁটার জন্য রাবারের স্যান্ডেল বা ট্রেকিংয়ের জন্য উপযুক্ত জুতো পরা জরুরি।

* দয়া করে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল বা যেকোনো ধরনের অপচনশীল বর্জ্য প্রকৃতির বুকে ফেলে আসবেন না। নিজের সঙ্গে ফিরিয়ে আনুন। আসুন, এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের রূপ অক্ষুণ্ণ রাখি।

পাঠকপ্রিয়