সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

প্রতি দুটি বাড়ির একটিতেই মিলছে এডিসের লার্ভা! আগ্রাবাদে ঝুঁকির মাত্রা ৭ গুণ বেশি, জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ

জিকার টাইম বোমায় চট্টগ্রাম: ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ারও উচ্চ ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরী যেন এক নীরব ঘাতকের নিশানায়। আপনার বাড়ির ফুলের টবে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি, পরিত্যক্ত টায়ার বা ডাবের খোসার মধ্যেই হয়তো বেড়ে উঠছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জিকার মতো ভয়ঙ্কর তিনটি রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা।

সম্প্রতি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। সংস্থাটি চট্টগ্রামকে এই তিন রোগের জন্য ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য লাল সংকেত দিয়েছে।

গত সোমবার (২১ জুলাই) আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীনের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ আশঙ্কার কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিপদের মাত্রা কতটুকু?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপক ‘ব্রেটিও ইনডেক্স’ (বিআই) যদি ২০-এর বেশি হয়, তবে সেই এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আইইডিসিআরের জরিপে যা পাওয়া গেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় এই ইনডেক্স পাওয়া গেছে ১৩৪ দশমিক ৬২, যা ঝুঁকির স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি!

শুধু আগ্রাবাদই নয়, জরিপ চালানো অন্য এলাকাগুলোর অবস্থাও ভয়াবহ। পাহাড়তলীতে বিআই ১১০, হালিশহরে ৬৬ দশমিক ৬৭ এবং চট্টেশ্বরী, ওআর নিজাম রোড ও ঝাউতলা এলাকায় বিআই ৩৩ থেকে ৪৮-এর মধ্যে পাওয়া গেছে। সহজ কথায়, এসব এলাকার প্রতি দুটি বাড়ির একটিতেই মিলেছে এডিস মশার লার্ভা।

নীরব ঘাতক ‘এডিস এজিপ্টি’র রাজত্ব

আরও বড় বিপদের কারণ হলো, সংগৃহীত লার্ভার নমুনার ৬৫ শতাংশই ‘এডিস এজিপ্টি’ প্রজাতির। এই প্রজাতিটিই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য প্রধানত দায়ী। আইইডিসিআরের গবেষক দলের প্রধান ডা. মো. ওমর কাইয়ুম বলেন, “এডিস এজিপ্টি মশার উপস্থিতিই প্রমাণ করে ঝুঁকি কতটা প্রকট। এখন স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত এই মশার বিস্তার রোধ করতে হবে।”

এই জরিপটি চালানো হয় গত ১২ থেকে ১৮ জুলাই। জুলাই মাসেই চট্টগ্রামে দুজন জিকা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর আইইডিসিআরের গবেষক দল চট্টগ্রামে আসে এবং নগরের ৯, ১৩, ১৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে এই জরিপ চালায়। জরিপকালে তিনজন জিকা এবং তিনজন চিকুনগুনিয়া রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে তাদের রোগ নিশ্চিত করা হয়। এটি প্রমাণ করে, ঝুঁকি কেবল সম্ভাবনার পর্যায়ে নেই, বিপদ ইতিমধ্যে দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে।

জরুরি সুপারিশ

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম আইইডিসিআরের প্রতিবেদন প্রাপ্তির কথা স্বীকার করে বলেন, “গবেষণা প্রতিবেদন এবং সুপারিশ অনুযায়ী আমরা চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করে যাব।”

আইইডিসিআর তাদের প্রতিবেদনে তিনটি জরুরি সুপারিশ করেছে:

১. ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকার মতো উপসর্গযুক্ত রোগীদের লক্ষণ বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করা।

২. জরিপের ফলাফল অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অনতিবিলম্বে ব্যাপক আকারে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম (লার্ভিসাইডিং ও ফগিং) পরিচালনা করা।

৩. মশক নিধন কার্যক্রমে সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সচেতন করা।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জরিপে উঠে আসা পাঁচটি ওয়ার্ডের চিত্রই হয়তো পুরো নগরীর প্রতিচ্ছবি। এখনই যদি সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষ একযোগে এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নামে, তবে বন্দরনগরীতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকার মহামারী ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পাঠকপ্রিয়