সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ফজলে করিমের দাপটে পুকুর গিলে ‘ডিএন প্লাজা’, মামলা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের লাগল ১৫ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের রাউজানে শত বছরের পুরোনো একটি পুকুর ভরাট করে বিপণিকেন্দ্র ও আবাসন তৈরির ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

ক্ষমতার দাপটে ১৫ বছর আগে পুকুরটি ভরাট করা হলেও সাবেক এই আওয়ামী লীগ নেতার ভয়ে এতদিন কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি সংস্থাটি, এমনকি অধিদপ্তর থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিল এ সংক্রান্ত নথিও।

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই প্রধান সড়কের পাশে রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় পাড়সহ প্রায় সোয়া এক একরের এই জলাধারটি ‘পাহাড়তলী জামে মসজিদ পুকুর’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১০ সাল থেকে পুকুরটি ভরাট করা শুরু হয়, যার তদারকিতে ছিলেন তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রোকন উদ্দীন। বর্তমানে সেখানে ‘ডিএন প্লাজা’ নামের বহুতল বিপণিকেন্দ্র, আবাসন, কৃত্রিম টার্ফ এবং ভাড়ার জন্য কলোনি নির্মাণ করা হয়েছে।

পুকুরটি বাঁচাতে এর লাগোয়া পাহাড়তলী চৌমুহনী জামে মসজিদের মোতোয়ালি এ কে এম আকতার কামাল চৌধুরী তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের শরণাপন্ন হলে ভরাটকাজ মাসখানেকের জন্য বন্ধ ছিল। কিন্তু ফজলে করিম চৌধুরীর প্রভাবে পুনরায় ভরাটকাজ শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে জলাধারটিকে ভিটায় রূপান্তর করা হয়।

এর পরিণতিও ভোগ করতে হয়েছে আকতার কামালকে। তার অভিযোগ, ফজলে করিম চৌধুরী তাকে ফোনে হুমকি দিয়েছিলেন এবং ২০২০ সালে তার ব্যক্তিগত দোকান দখল করে সেখানে পাহাড়তলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর ২০১০ সালের ৬ জুন নোটিশ দিয়েও ভরাটকাজ বন্ধ করা যায়নি। পরে ২০১১ সালের ৫ মার্চ ঢাকায় এনফোর্সমেন্ট মামলা করে অভিযুক্তদের ২ লাখ ৩০ হাজার ৫৮০ টাকা জরিমানা করা হয়। সে সময় অভিযুক্তরা পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও তা রক্ষা করেননি। এরপর ফজলে করিমের ভয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর আর মামলা করার সাহস পায়নি।

গত বছরের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফজলে করিম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে এবং অভিযুক্ত অন্যরা পলাতক থাকায় পরিস্থিতি পাল্টায়। দীর্ঘ ১৫ বছর পর চলতি বছরের ৪ আগস্ট পরিবেশ অধিদপ্তর রোকন উদ্দীনসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে একটি জিডি করে।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার গবেষণা কর্মকর্তা মো. আশরাফ উদ্দীন বলেন, “অধিদপ্তর থেকে পাহাড়তলী মসজিদ পুকুর ভরাট-সংক্রান্ত নথি গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো আবার সংগ্রহ করা হয়েছে। জমির শ্রেণি পুকুর থেকে পরিবর্তন করে ভিটে করা হয়েছিল, আমরা তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আবেদন করেছি।”

মসজিদের মোতোয়ালি আকতার কামাল জানান, পুকুরটির ২৭ শতাংশ জমি সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে মসজিদের নামে ইজারা নেওয়া এবং আরও ৭ শতাংশ মসজিদের নিজস্ব। এখন ৪ শতাংশ ছাড়া বাকি জমি দখলের শিকার। তিনি বলেন, পটপরিবর্তনের পর তিনি দখলকৃত দোকান ও জমি পুনরুদ্ধার করেছেন এবং আগের ঘটনা উল্লেখ করে দুটি জিডি করেছেন।

রাউজান থানার উপপরিদর্শক মো. রেজাউল বলেন, “আকতার কামাল নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুকুরও ভরাট করা হয়। বিষয়গুলোর তদন্ত চলছে।”

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “পরিবেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে দুর্বৃত্তায়নের কারণে। আর স্বৈরাচারী শাসনামলে সেই দুর্বৃত্তায়ন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একজন আইনপ্রণেতা আইন ভেঙে পুকুর ভরাট করে ফেলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আবার মামলা করা যায় না, এটা আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকি। এখন মামলাটা শুরু হয়েছে, সেটা আশার কথা।”

পাঠকপ্রিয়