এই শান্ত শহরতলির এক গ্রীষ্মের সকালে নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল এক অধ্যায়। ৯৭ বছরের বর্ণময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটালেন জেমস আর্থার লোভেল, যিনি জিম লোভেল নামেই পরিচিত। তিনি ছিলেন সেই নভোচারী, যিনি চাঁদের মাটিকে ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করেও এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা থেকে ফিরে এসেছিলেন পৃথিবীতে। তাঁর বিদায় যেন মহাকাশ অভিযানের সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য ছিল একচুল, আর প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। লোভেল শুধু একজন নভোচারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের এক দুঃসাহসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতীক—যেখানে জীবন, প্রযুক্তি আর দলগত দক্ষতা একসাথে এক অভূতপূর্ব পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
১৯৭০ সালের ১৩ এপ্রিল। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার কিলোমিটার দূরে, মহাকাশের অনন্ত শূন্যতায় ছুটে চলেছে অ্যাপোলো–১৩। কমান্ডার জিম লোভেলের নেতৃত্বে চাঁদের বুকে তৃতীয়বারের মতো মানুষের পদচিহ্ন আঁকার স্বপ্ন দেখছে পৃথিবী। হঠাৎই এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ। নিয়ন্ত্রণকক্ষে কাঁপা কাঁপা অথচ শান্ত স্বরে ভেসে এল সেই বিখ্যাত বার্তা, যা মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে:
“হিউস্টন, আমাদের একটি সমস্যা হয়েছে।”
লোভেলের কণ্ঠ ছিল পেশাদার নভোচারীর মতোই স্থির, কিন্তু পরিস্থিতি ছিল ভয়ংকর। মহাকাশযানের দুটি অক্সিজেন ট্যাংকের একটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল। এখন লক্ষ্য একটাই—বেঁচে ফেরা। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াই চলেছিল পরবর্তী ৮৭ ঘণ্টা ধরে, যা আজও ‘সফল ব্যর্থতা’ হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা।
শৈশব থেকে মহাকাশে: এক স্বপ্নবাজের পথচলা
১৯২৮ সালের ২৫ মার্চ, ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে জন্ম জেমস আর্থার লোভেলের। তাঁর বাবা অল্প বয়সেই মারা যান। মা একা হাতে মানুষ করেন তাঁকে। ছোটবেলা থেকেই রকেট ও মহাকাশের প্রতি ছিল তাঁর তীব্র আকর্ষণ। সহপাঠীরা যখন খেলাধুলায় মগ্ন, কিশোর লোভেল তখন নিজের তৈরি করা মডেল রকেট আকাশে ওড়াতেন। আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে তাঁর কেটেছে অসংখ্য রাত। স্বপ্ন দেখতেন, একদিন তিনিও পাড়ি দেবেন ওই দূর নক্ষত্রের দেশে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ তখন আমেরিকায়। দেশপ্রেমের টানে তিনি যোগ দেন নৌবাহিনীতে। একজন দক্ষ পাইলট হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর নিখুঁত উড্ডয়ন দক্ষতা, শীতল মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অসামান্য নেতৃত্বগুণ তাঁকে নাসার নজরে নিয়ে আসে। ১৯৬২ সালে, ‘দ্য নিউ নাইন’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় নভোচারী দলের সদস্য হিসেবে তিনি নাসায় যোগ দেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন পূরণের যাত্রা।
লোভেল চারটি ভিন্ন মহাকাশ মিশনে অংশ নিয়েছেন। জেমিনি-৭ মিশনে তিনি ফ্রাঙ্ক বোরম্যানের সঙ্গে মহাকাশে প্রায় ১৪ দিন কাটান, যা সেই সময়ে একটি রেকর্ড ছিল। জেমিনি-১২ মিশনে তিনি বাজ অলড্রিনের সঙ্গে মহাকাশে হাঁটার প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি মিশন হলো অ্যাপোলো-৮ এবং অ্যাপোলো-১৩।
অ্যাপোলো-৮ ছিল मानव ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে লোভেল, ফ্রাঙ্ক বোরম্যান ও বিল আন্ডার্স পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে প্রথমবার চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেন। বড়দিনের সকালে তাঁরা যখন চাঁদের পেছন থেকে পৃথিবীকে উদিত হতে দেখেন, সেই দৃশ্য ছিল অপার্থিব। বিল আন্ডার্সের তোলা সেই বিখ্যাত “Earthrise” ছবিটি পৃথিবীর মানুষকে প্রথমবার শিখিয়েছিল আমাদের এই গ্রহ কতটা সুন্দর, নীল এবং ভঙ্গুর। সেই অভিযানের সময় তাঁরা বাইবেলের ‘বুক অফ জেনেসিস’ থেকে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল।
অ্যাপোলো–১৩: ইতিহাসের সফলতম ব্যর্থতা
অ্যাপোলো-৮ মিশনের পর লোভেলকে অ্যাপোলো-১৪ মিশনের কমান্ডার হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু অ্যাপোলো-১৩-এর মূল কমান্ডার অ্যালান শেপার্ডের কানে সমস্যা দেখা দেওয়ায় লোভেলকে সেই মিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চাঁদে হাঁটার সুযোগ পেয়ে তিনি ছিলেন উচ্ছ্বসিত।
১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল, কমান্ডার জিম লোভেল, কমান্ড মডিউল পাইলট জন সুইগার্ট এবং লুনার মডিউল পাইলট ফ্রেড হাইসকে নিয়ে অ্যাপোলো-১৩ চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। যাত্রার প্রথম দুই দিন সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু তৃতীয় দিনে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে সাধারণ একটি অক্সিজেন ট্যাংক নাড়াচাড়া করার সময় ঘটে সেই বিস্ফোরণ।
বিস্ফোরণের পর সার্ভিস মডিউলটি প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। কমান্ড মডিউলের শক্তিও দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। বেঁচে ফেরার একমাত্র উপায় ছিল লুনার মডিউল ‘অ্যাকুয়ারিয়াস’। এই যানটি তৈরি করা হয়েছিল কেবল দুজন নভোচারীকে চাঁদের বুকে নামানোর জন্য। কিন্তু এখন এটিকেই তিনজন নভোচারীর জন্য একটি ‘লাইফবোট’ বা জীবনতরী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
নাসার মিশন কন্ট্রোলে তখন চরম উত্তেজনা। ফ্লাইট ডিরেক্টর জিন ক্রাঞ্জ তাঁর দলকে বলেছিলেন সেই বিখ্যাত কথা, “ব্যর্থতা কোনো বিকল্প নয়।”
পরবর্তী ৮৭ ঘণ্টা ছিল মানব সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং দলগত কাজের এক চরম পরীক্ষা। লুনার মডিউলের সীমিত শক্তিতে তিনজন মানুষের বেঁচে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গিয়েছিল। নভোচারীরা ঠকঠক করে কাঁপছিলেন। খাবারের অভাব, জলের সংকট এবং সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। কমান্ড মডিউলের কার্বন ডাই-অক্সাইড ফিল্টারগুলো ছিল চারকোনা, আর লুনার মডিউলের ফিল্টারগুলো ছিল গোলাকার। হিউস্টনের প্রকৌশলীরা তখন পৃথিবীতে বসে ডাক্ট টেপ, প্লাস্টিকের ব্যাগ আর কার্ডবোর্ড দিয়ে একটি সংযোগকারী যন্ত্র তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং নভোচারীদের তা বুঝিয়ে দেন। সেই जुगाड़ প্রযুক্তিই তাঁদের জীবন বাঁচিয়েছিল।
অবশেষে, ১৭ এপ্রিল, অ্যাপোলো-১৩ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সেই কয়েক মিনিট ছিল পৃথিবীর জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। তারপরই প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলে প্যারাস্যুটের মাধ্যমে নেমে আসে তাঁদের মহাকাশযান। এক অবিশ্বাস্য লড়াই শেষে ঘরে ফেরা তিন বীরকে দেখে উল্লসিত হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ব। যে মিশন চাঁদে যেতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটিই হয়ে ওঠে নাসার সবচেয়ে বড় সাফল্যের প্রতীক। কারণ এটি প্রমাণ করেছিল, বিপদে মাথা ঠান্ডা রেখে, দলবদ্ধভাবে কাজ করলে অসম্ভবকেও জয় করা যায়।
গাগারিন থেকে হুইটসন: মানুষের মহাকাশযাত্রার পথচলা
লোভেলের গল্প একা নয়। মহাকাশের ইতিহাসে এমন আরও অনেক পথপ্রদর্শক রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানবতার দিগন্তকে প্রসারিত করেছেন।
ইউরি গাগারিন: প্রথম তারা
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে ভোস্টক-১ মহাকাশযানে চেপে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম মানুষ হিসেবে পাড়ি জমান ইউরি গাগারিন। মাত্র ১০৮ মিনিটের সেই ফ্লাইট বদলে দিয়েছিল ইতিহাস। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, “চলো যাই!” হয়ে ওঠে মহাকাশ জয়ের সূচনা সঙ্গীত। ঠান্ডা যুদ্ধের সেই যুগে গাগারিনের এই সাফল্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক বিজয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশ দৌড়ে আরও মরিয়া করে তোলে। এক সাধারণ কাঠমিস্ত্রির ছেলে থেকে মহাকাশের প্রথম বীর হয়ে ওঠা গাগারিনের হাসি মুখ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
অ্যালান শেপার্ড: আমেরিকার জবাব ও চাঁদের গলফার
গাগারিনের ফ্লাইটের মাত্র ২৩ দিন পর, ১৯৬১ সালের ৫ মে, অ্যালান শেপার্ড ‘ফ্রিডম-৭’ ক্যাপসুলে চড়ে মহাকাশে যান। তাঁর ফ্লাইটটি ছিল মাত্র ১৫ মিনিটের সাব-অরবিটাল ফ্লাইট, কিন্তু এটি ছিল আমেরিকার মহাকাশ জয়ের প্রথম পদক্ষেপ। শেপার্ড পরে অ্যাপোলো-১৪ মিশনের কমান্ডার হিসেবে চাঁদে পা রাখেন এবং সেখানে দুটি গলফ বল মারেন। তিনি মজা করে বলেছিলেন বলটি “মাইল মাইল দূরে” চলে গেছে। এই ঘটনাটি দেখিয়েছিল, মহাকাশের মতো প্রতিকূল পরিবেশেও মানুষ তার স্বাভাবিক ক্রীড়ামোদী সত্তাকে ধরে রাখতে পারে।
জন গ্লেন: আমেরিকার বীর ও বয়স্কতম নভোচারী
১৯৬২ সালে জন গ্লেন প্রথম আমেরিকান হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথ তিনবার প্রদক্ষিণ করেন। তাঁর এই সাফল্য আমেরিকাকে মহাকাশ দৌড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমকক্ষ করে তোলে। কিন্তু গ্লেনের গল্প এখানেই শেষ নয়। এর ৩৬ বছর পর, ১৯৯৮ সালে, ৭৭ বছর বয়সে তিনি আবারও মহাকাশে যান স্পেস শাটল ডিসকভারিতে চড়ে। সবচেয়ে বয়স্ক নভোচারী হিসেবে তাঁর এই মিশন প্রমাণ করে, বয়স শুধুমাত্র একটি সংখ্যা এবং মানুষের জানার আগ্রহ ও সাহস কখনো ফুরোয় না।
ওয়াল্লি শির্রা: তিন প্রোগ্রামের জাদুকর
ওয়াল্লি শির্রা ছিলেন একমাত্র আমেরিকান নভোচারী যিনি আমেরিকার প্রথম তিনটি মহাকাশ কর্মসূচিতেই (মের্কুরি, জেমিনি ও অ্যাপোলো) অংশ নিয়েছেন। তাঁর অসামান্য পেশাদারিত্ব, রসবোধ এবং সহকর্মীদের প্রতি গভীর আস্থা তাঁকে নভোচারীদের মধ্যে ‘কমান্ডারের কমান্ডার’ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মহাকাশ অভিযান কেবল প্রযুক্তি নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের ওপরও নির্ভরশীল।
জিন সার্নান: চাঁদের শেষ পদচিহ্ন
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের কমান্ডার হিসেবে জিন সার্নান ছিলেন চাঁদের বুকে হাঁটা শেষ মানুষ। চাঁদ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তিনি চাঁদের মাটিতে তাঁর শিশুকন্যা ট্রেসির নামের আদ্যক্ষর ‘TDC’ খোদাই করে আসেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা যেমন এসেছিলাম, তেমনই ফিরে যাচ্ছি, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আমরা আবার ফিরে আসব, সমস্ত মানবজাতির জন্য শান্তি ও আশা নিয়ে।” তাঁর এই কথাগুলো আজও মহাকাশপ্রেমীদের হৃদয়ে এক ধরনের শূন্যতা এবং ফিরে যাওয়ার আকুতি তৈরি করে।
নারীর নতুন অধ্যায়: পেগি হুইটসন
মহাকাশ অভিযান বহুদিন পর্যন্ত ছিল পুরুষদের একচেটিয়া জগৎ। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন পেগি হুইটসনের মতো মহীয়সী নারীরা। তিনি মহাকাশে সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো মার্কিন নভোচারী—মোট ৬৬৫ দিন। তিনি ১০টি স্পেসওয়াক করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) প্রথম মহিলা কমান্ডার হয়েছেন। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখার অধিকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের। হুইটসনের ভাষায়, “মহাকাশে থাকাটা এমন এক স্কুলে পড়ার মতো, যেখানে প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকে।”
ফ্র্যাঙ্ক রুবিও: ধৈর্যের নতুন রেকর্ড
২০২৩ সালে নাসার নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক রুবিও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে একটানা ৩৭১ দিন কাটিয়ে একটি নতুন মার্কিন রেকর্ড গড়েন। একটি ত্রুটিপূর্ণ সয়ুজ ক্যাপসুলের কারণে তাঁর মিশন অনির্ধারিতভাবে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। তাঁর এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের মঙ্গলগ্রহ অভিযানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ মঙ্গলে যেতে এবং ফিরতে নভোচারীদের দীর্ঘ সময় মহাকাশে কাটাতে হবে। রুবিওর মিশন অ্যাপোলো-১৩-এর মতোই মনে করিয়ে দেয়, মহাকাশ যাত্রা আজও কতটা অপ্রত্যাশিত হতে পারে।
মহাকাশের মানবিক উত্তরাধিকার
জিম লোভেলের মৃত্যু আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিল—এই মহাকাশ যাত্রাগুলো কেবল প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের প্রদর্শনী নয়; এগুলো মানব সাহস, অদম্য নেতৃত্ব, গভীর সহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার মুখে বেঁচে থাকার চিরন্তন গল্প। গাগারিনের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস, শেপার্ডের শৌখিন গলফ শট, গ্লেনের বার্ধক্যের প্রত্যাবর্তন, লোভেলের শীতল মস্তিষ্কের নেতৃত্ব, সার্নানের বিদায়ী বার্তা, আর হুইটসনের ধৈর্য—এই সবই মিলেমিশে তৈরি হয়েছে মানবতার এক মহাকাব্য।
আজকের দিনে নাসা, স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিন কিংবা চীনের মহাকাশ কর্মসূচি—সবাই এই কিংবদন্তিদের দেখানো পথেরই উত্তরসূরি। চাঁদে মানুষের বসতি গড়ার প্রস্তুতি চলছে, মঙ্গলের লাল মাটির দিকে তাকিয়ে আছে মানব সভ্যতা। কিন্তু প্রতিটি নতুন পদক্ষেপের পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে অতীতের সেই মুখগুলো, যাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন—মহাকাশে যাওয়া মানে শুধু নতুন একটি গ্রহে পৌঁছানো নয়, বরং নিজের ভেতরের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা।
লোভেলের শেষ উড়ান
জিম লোভেলের পার্থিব জীবনযাত্রা শেষ হলো লেক ফরেস্টের সেই শান্ত সকালে। অ্যাপোলো-১৩ চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রে অভিনয় করা কিংবদন্তি অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস একবার বলেছিলেন:
“কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সাহস দেখাতে জানেন। স্বপ্ন দেখতে জানেন। তাঁরা আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে আমরা একা একা কখনোই যেতে পারতাম না।”
জিম লোভেল ছিলেন সেই মানুষদের একজন। তিনি আর কোনো মহাকাশযানে চড়ে উড়বেন না, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গল্প, তাঁর নেতৃত্ব এবং তাঁর সেই ‘সফল ব্যর্থতা’র কাহিনি নতুন প্রজন্মকে মহাকাশের দিকে তাকাতে, স্বপ্ন দেখতে এবং অসম্ভবকে জয় করতে শিখিয়ে যাবে—যতদিন পর্যন্ত না আকাশে একটিও তারা জ্বলে। তাঁর যাত্রা শেষ হয়েছে, কিন্তু মানবতার মহাকাশ ভ্রমণ চলবেই।