কৃষকদের আধুনিক যন্ত্রের মালিক বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি লোপাট করেছে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। অস্তিত্বহীন যন্ত্র ও একই যন্ত্র একাধিকবার দেখিয়ে সরকারের এই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ১২টি কোম্পানির বিরুদ্ধে। এ দুর্নীতির ঘটনায় সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক কারাগারে থাকলেও মূল অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যদিও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে।
শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পাঁচ বছর আগে সরকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি’ শুরু করে। এর আওতায় কম্বাইন হার্ভেস্টরের মতো যন্ত্রে কৃষকদের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভর্তুকিকে কেন্দ্র করেই দুর্নীতির আশ্রয় নেয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রকল্প অফিস ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ৮৫৪টি কম্বাইন হার্ভেস্টরের বিপরীতে একাধিকবার ভর্তুকির বিল তুলেছে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। একই সময়ে আরও ৯৭১টি যন্ত্রের বিপরীতে ভর্তুকির টাকা নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর মাঠে কোনো অস্তিত্বই নেই।
এই জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, একই কৃষিযন্ত্র একাধিকবার বিতরণ দেখিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৯৫ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া, আমদানি করা কম্বাইন হার্ভেস্টরের চেয়ে বেশি সংখ্যক যন্ত্র বিতরণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো ৭৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সব মিলিয়ে শুধু কম্বাইন হার্ভেস্টর খাতে ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে।
অডিট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রের প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে দাম বেশি দেখানো, নিম্নমানের যন্ত্র আমদানি, চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর জালিয়াতি এবং হাওর বা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ৭০ শতাংশ ভর্তুকি সমতল এলাকার যন্ত্রের জন্য তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে কোম্পানিগুলো।
প্রকল্প অফিসের তথ্যে দেখা যায়, আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ, আবেদিন ইকুইপমেন্ট, চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি, মেটাল অ্যাগ্রিটেক, এসিআই মোটরস, এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাকডোনাল্ড ক্রপ কেয়ার, গ্রিনল্যান্ড টেকনোলজিস, উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলামার্ক ও আদি এন্টারপ্রাইজসহ ১২টি প্রতিষ্ঠান এই ভর্তুকি লোপাটের সঙ্গে জড়িত। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, চুক্তি লঙ্ঘন করলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্তসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “সরবরাহকারী যারা অনিয়ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য আমরা দুদকে চিঠি দিয়েছি। একই সঙ্গে আমরা এসব সরবরাহকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করব। এ নিয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রকল্পে যে অনিয়ম হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার তদন্ত করছে।
২০২০ সালে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি যখন অনুমোদন পায়, তখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের শুরুতে দুদক তদন্ত শুরু করলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। গত জুলাই মাস থেকে দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সাবেক তিন প্রকল্প পরিচালকসহ ১২ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।
এদিকে, সরকারি ভর্তুকি আত্মসাতের পাশাপাশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের ঋণের ফাঁদে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে কিস্তিতে নিম্নমানের যন্ত্র বিক্রি করেছে তারা। এখন কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে যন্ত্র তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোম্পানির লোকজন।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার কৃষক হামিদুর রহমানের অভিযোগ, কিছু টাকা বকেয়া থাকায় আদি এন্টারপ্রাইজের লোকজন তার হার্ভেস্টরটি জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে গেছে। একই ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক মমিন সরকার এবং বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাদল বল্লভের সঙ্গেও। তাদের হার্ভেস্টর তুলে নিয়ে গেছে এসিআই মোটরস।
এ ধরনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি অফিসের সামনে মানববন্ধনও করেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
অভিযোগের বিষয়ে এসিআই এগ্রোবিজনেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এফ এইচ আনসারি বলেন, “অনেকে যন্ত্র নিয়ে ফেলে রেখেছেন আবার কিস্তির টাকাও পরিশোধ করছেন না। সেক্ষেত্রে আমরা কিছু যন্ত্র তাদের কাছ থেকে নিয়ে এসে অন্যত্র বিক্রি করে আমাদের টাকা তুলেছি। প্রকল্পের ভর্তুকি বন্ধ থাকায় আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি।”