গ্রাহকদের বীমা দাবির সাত হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ না করায় দেশের বীমা খাত তীব্র আস্থা সংকটে পড়েছে। মেয়াদপূর্তির পরও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না প্রায় ১৩ লাখ গ্রাহক। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি কোম্পানির কাছেই আটকে আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া দাবির ৭৭ শতাংশ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বলছে, আইনের দুর্বলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সংকট কাটাতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইডিআরএ’র সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বীমা দাবি পরিশোধ না করার তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স; তাদের কাছে গ্রাহকদের পাওনা দুই হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাধারণ বীমা করপোরেশনের কাছে বকেয়া রয়েছে এক হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের কাছে আটকে আছে ২৭০ কোটি টাকা। এছাড়া এস আলম গ্রুপের পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স ২৪০ কোটি এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স ১৭৫ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ করেনি।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, পলিসির টাকা জমা দিলেও তা অনেক সময় কোম্পানিতে পৌঁছায় না, এজেন্টরা আত্মসাৎ করেন। আবার কোম্পানিতে টাকা জমা হলেও নানা অজুহাতে বছরের পর বছর দাবির টাকা আটকে রাখা হচ্ছে।
আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম বলেন, “দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাবে গ্রাহকদের বীমা দাবির অর্থ ঠিকমতো পরিশোধ হয়নি। বিদ্যমান আইনে আইডিআরএ যথাযথভাবে তদারকি বা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এতে দুর্নীতি, অনিয়মসহ বহু কিছু হয়েছে, কিন্তু আইডিআরএ কিছু করতে পারেনি। আইডিআরএকে শুধু আইনগতভাবে পঙ্গু করা হয়নি, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করা হয়েছে।”
তিনি জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রিমিয়ামের প্রবৃদ্ধি, পলিসি নবায়নের হার, দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও আইন পরিপালনসহ সাতটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ নিরীক্ষা চালানো হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইডিআরএর পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক কোম্পানি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এসে ইচ্ছামতো কার্যক্রম চালিয়েছে। এ কারণেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের একজন শাহিনুর বেগম। তিনি জানান, তার ৬০ হাজার টাকার একটি পলিসির মেয়াদ ২০২০ সালে শেষ হলেও সানলাইফ ইনস্যুরেন্স এখনও টাকা পরিশোধ করেনি। অথচ বীমা আইন অনুযায়ী, পলিসির মেয়াদ শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমার ৯০ দিনের মধ্যে গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি করার কথা।
তবে খাতের সব কোম্পানির চিত্র এক নয়। আইডিআরএ’র তথ্যমতে, আলফা ইসলামী, এলআইসি, মার্কেন্টাইল ও সান্তা লাইফ ইনস্যুরেন্স শতভাগ দাবি পরিশোধ করেছে। রূপালী, ট্রাস্ট, সোনালী, গার্ডিয়ান ও মেটলাইফসহ আরও ১২টির বেশি কোম্পানির দাবি পূরণের হার ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি বড় কোম্পানির দাবি পরিশোধে ধারাবাহিক ব্যর্থতা পুরো খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। একসময় জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান প্রায় ১ শতাংশ থাকলেও এখন তা কমে ০.৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।