সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য বরাদ্দ ৬০ শতাংশ কোটা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাদ দেওয়া হয়েছে পোষ্য ও পুরুষ কোটাও। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য ৭ শতাংশ কোটা রাখা হবে। বাকি ৯৩ শতাংশ পদ পূরণ হবে মেধার ভিত্তিতে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার রাতে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে। রাষ্ট্রপতির আদেশে এতে স্বাক্ষর করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শর্ত
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন করতে হলে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে এবং শিক্ষাজীবনের কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ বছর। মৌলিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং চাকরির চার বছরের মধ্যে এটি সম্পন্ন করতে হবে।
মেধাভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য এবং বাকি ৮০ শতাংশ পদ অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পূর্বের কোটা ব্যবস্থা
২০১৯ সালের বিধিমালায় সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের ৬০ শতাংশ বরাদ্দ ছিল নারী প্রার্থীদের জন্য, ২০ শতাংশ পোষ্য কোটা এবং ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীদের জন্য। নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। তবে হাইকোর্টের রায় অনুসারে কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।
সমালোচনা ও মতামত
নারী কোটা বাতিলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। তিনি বলেন, “কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমছে। এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদও বলেন, প্রাথমিক শ্রেণির কার্যক্রমে নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে নতুন প্রজ্ঞাপনে এ সুপারিশ প্রতিফলিত হয়নি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, বিশেষ করে চর, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া না যাওয়ায় সেখানে বিশেষ কোটা রাখা যেতে পারে।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগে পরিবর্তন
বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ৮০ শতাংশ পদ পূরণ হবে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে, বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। পদোন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষকের চাকরি স্থায়ীকরণের পর ১২ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যা আগে ছিল ৭ বছর।
পরীক্ষার কাঠামো
সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। এর মধ্যে লিখিত ৯০ এবং মৌখিক ১০ নম্বর। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা ২৫, ইংরেজি ২৫, গণিত ও বিজ্ঞান ২০ এবং সাধারণ জ্ঞান ২০ নম্বর থাকবে। পাস করতে হলে উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে।
শূন্যপদ ও নতুন পদ সৃষ্টি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে শূন্য পদ ছিল ৮ হাজার ৪৩টি। এ ছাড়া সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য নতুন করে ৫ হাজার ১৬৬টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, আগামী মাসেই এসব পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতে পারে।