চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ছাত্রীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দুই দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ক্যাম্পাসকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এতে একজন উপ-উপাচার্য ও একজন প্রক্টরসহ দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এবং শতাধিক গ্রামবাসী আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকে উপাচার্য ও প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও সংকট কাটেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ‘অস্ত্রাগার’ থেকে শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রায় ১৩০টি রামদা লুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা পুরো সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সংকটের সূত্রপাত ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
গত ৩০ আগস্ট, শনিবার মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন জোবরা গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় প্রবেশের সময় দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে তার ভবনের দারোয়ান মারধর করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা দারোয়ানের পক্ষ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করা হয়। রাতভর চলা সংঘর্ষে অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
পরদিন, ৩১ আগস্ট রোববার সকাল থেকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচারসহ তিন দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক অবরোধ করে। এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ও সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন এসেও পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেননি।
দুপুর ১২টার দিকে ২ নম্বর গেট এলাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা পুনরায় মুখোমুখি অবস্থান নিলে দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ইটের আঘাতে সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন, প্রক্টর অধ্যাপক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফসহ কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের ওপর রামদা ও লোহার রড নিয়ে হামলা চালানো হয়। এই দফায় আরও শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
আহতদের আর্তনাদ ও প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ
দুই দিনের সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ ছয় দিন ধরে চট্টগ্রামের পার্ক ভিউ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। তার মা শাহানাজ আমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতির কারণে এতগুলো শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। কোটি টাকা দিলেও তো আমার ছেলে আগের মতো হবে না।”
একই সংঘর্ষে রামদার কোপে আহত সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন মিয়ার মাথার খুলির একটি অংশ অস্ত্রোপচারে ফেলে দিতে হয়েছে। তার মাথার ব্যান্ডেজে লেখা হয়েছে ‘হাড় নেই, চাপ দেবেন না’। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের নাইমুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম হাসপাতালে এই তিন শিক্ষার্থীকে দেখতে যান।
প্রশাসনের ভূমিকা ও অস্ত্রাগার বিতর্ক
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন নিজেও পুলিশের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর নাজমুল হোসাইন এক বৈঠকে জানান, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অস্ত্রাগার’ থেকে প্রায় ১৩০টি রামদা লুট করেছে, যা পূর্বে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করে জমা রাখা হয়েছিল। অস্ত্রগুলো পুলিশের কাছে জমা না দিয়ে ‘অস্ত্রাগারে’ রেখে দেওয়ায় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস
সংঘর্ষের পর থেকে উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ও প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবিতে প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, মশালমিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে ছাত্রদল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ এবং ‘নারী অঙ্গন’সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ, হামলাকারীদের বিচার, ক্যাম্পাসে শতভাগ নিরাপত্তা ও আবাসন নিশ্চিত করা। ‘নারী অঙ্গন’ নামে একটি সংগঠন নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ‘মোরাল পুলিশিং’ ও প্রশাসনের অবহেলার প্রতিবাদে খোলাচিঠিও পাঠ করেছে।
মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে ১০টি নতুন আবাসিক হল নির্মাণ ও একটি মডেল থানা স্থাপনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।