সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সাগরে মিলছে না মাছ, কারণ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা রহিমা আক্তার থাইরয়েডের রোগী, যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ সামুদ্রিক মাছ খাওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে পছন্দের লইট্টা, পোয়া বা ছুরি মাছ খুঁজে পাওয়াই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। রহিমা আক্তারের এই অভিজ্ঞতা এখন দেশের অনেকেরই।

ভোক্তাদের এই সংকটের প্রতিচ্ছবিই মিলছে সরকারি পরিসংখ্যানে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো ১ লাখ ৪৬ হাজার টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করলেও, ২০২৪ অর্থবছরে তা ২১ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৪ হাজার টনে নেমে এসেছে। জেলেরা বলছেন, সাগরে এখন মাছের চেয়ে জেলিফিশের সংখ্যাই বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, ব্যাপক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ত্রিমুখী প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদ আজ অস্তিত্বের সংকটে। এর ফলে লইট্টা, পোয়া, ছুরি, রূপচাঁদা, তাইল্যা ও বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ির মতো অনেক পরিচিত মাছ হয় বাণিজ্যিক বিপন্নতার শিকার বা পুরোপুরি উধাও হওয়ার পথে।

অতিরিক্ত আহরণ ও দূষণের প্রভাব

জেলে ও বিশেষজ্ঞরা একমত যে, সাগরে মাছ কমার অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত আহরণ। কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, রুপচাঁদা, তাইল্যা ও লাইট্টা মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারার ৪১ বছরের অভিজ্ঞ জেলে হান্নান বলেন, “অনেক মাছের এখন শুধু নামই টিকে আছে।”

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জাহাজ চলাচল, সমুদ্রে আবর্জনা ও তেল নিক্ষেপের কারণে সৃষ্ট দূষণ সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনচক্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, “দূষণ, অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল এবং শব্দ দূষণের কারণে মাছেরা বসবাসের নিরাপদ পরিবেশ হারাচ্ছে।”

জলবায়ু পরিবর্তন ও জেলিফিশের আগ্রাসন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাছের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুব্রত সরকার জানান, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জেলিফিশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৌমিত্র চৌধুরী জানান, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ফলে জেলিফিশের প্রাকৃতিক খাদক, যেমন—বড় মাছ ও কচ্ছপ, সমুদ্রে কমে গেছে। এর সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি জেলিফিশের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এই জেলিফিশ মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির লার্ভা খেয়ে ফেলে, যা মাছের বংশবৃদ্ধিতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, “বাজার পর্যবেক্ষণ করে আমরা বছরের পর বছর ধরে বেশ কয়েকটি মাছের প্রজাতির ঘাটতি দেখছি। সাগরে পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় অবৈধ জাল ও অনিয়ন্ত্রিত ট্রলার দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বঙ্গোপসাগরের অনেক সামুদ্রিক প্রজাতিই হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।

পাঠকপ্রিয়