করোনাভাইরাসের মতো মহামারির ভয়ঙ্কর অভিঘাত মোকাবিলা এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে প্রায় ৬,৩৮৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেটে একটি জরুরি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির ঋণ সহায়তায় চালিত ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ নামের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বিশেষ করে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো।
প্রকল্পের অধীনে দেশের ৫০টি জেলা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং ১৬টি হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) স্থাপনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এক হতাশাজনক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে।
প্রকল্পের সিংহভাগ কাজই বাকি, যা বাস্তবায়িত হয়েছে তাতেও রয়েছে অকার্যকারিতার ছাপ এবং দুর্নীতির অভিযোগ। স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি মৌলিক খাতে এ ধরনের রুগ্ণ দশা পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রকল্পের বাস্তব চিত্রটি রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক এক নিবিড় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই ব্যর্থতার কঙ্কালসার চেহারা ফুটে উঠেছে। গত পাঁচ বছরে ৫০টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ১৩টিতে। কিন্তু এই ১৩টি আইসিইউ-ও রোগীদের কোনো কাজে আসছে না।
কারণ, কোথাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিশিয়ানের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জীবন রক্ষাকারী ইউনিটগুলো এখন নিছকই শোপিস হিসেবে পড়ে আছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য ১৬টি হাসপাতালে পিআইসিইউ স্থাপনের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত একটিও স্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের বাস্তবায়ন অগ্রগতি শূন্য।
এই স্থবিরতার কারণে ইতোমধ্যে কেনা মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যদি দ্রুততম সময়ে এই আইসিইউগুলো চালু করা না যায়, তবে প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হওয়া হাজার কোটি টাকা আক্ষরিক অর্থেই গচ্চা যাবে।
কেন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি প্রকল্পের এই হাল? আইএমইডি’র প্রতিবেদনে এর পেছনে একাধিক কারণকে দায়ী করা হয়েছে। অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গত বছর ৫ আগস্টের পর ঠিকাদারের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে বারবার নকশা পরিবর্তন, সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া এবং অবিশ্বাস্যভাবে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রকল্পে মোট সাতজন পিডি বদল হয়েছেন, যা প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও ব্যবস্থাপনার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর কেনাকাটার ক্ষেত্রে ৪৬৪ কোটি টাকার বিশাল অডিট আপত্তি তুলেছে, যা প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) পর্যালোচনাতেও স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় নিয়ম লঙ্ঘন, অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং পণ্য বুঝে না পেয়েও ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।
এই প্রকল্পটি স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক দুর্দশার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১৯টি প্রকল্পের বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে; অব্যয়িত রয়ে গেছে ৭৯ শতাংশ বা প্রায় ৪,৪৪০ কোটি টাকা। মূল এডিপির হিসাবে এই ব্যর্থতা আরও প্রকট, যেখানে ব্যয়ের হার মাত্র ১১ শতাংশ এবং অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৯,৯২০ কোটি টাকা। সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য খাতই সবচেয়ে পিছিয়ে।
এই অচলাবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, বড় ক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প ব্যয় কম হচ্ছে। তিনি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন এবং নতুন পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পর পরিস্থিতি উন্নতির আশা করছেন।
আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিনও স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় অনিয়ম ও ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে যাদের ব্যর্থতায় এই পরিস্থিতি, সেই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এই নাজুক অবস্থার জন্য সুশাসনের অভাবকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, “বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। কেনাকাটায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্পে দেরি করিয়ে ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং বাড়তি মুনাফা লুটে নেয়। ঘন ঘন পিডি পরিবর্তন এবং সিস্টেমের দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে প্রকল্প দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা ছিল, সেটি নিজেই এখন অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর অদূরদর্শিতার কারণে ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে গেছে। এটি শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং সুশাসনের চরম অভাবের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। জনগণের করের টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকার কেবল কথার কথাই থেকে যাবে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।