সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সাফল্য পাচ্ছে ভারত-মিয়ানমার-পাকিস্তান, বিদেশি কোম্পানি টানতে পারছে না ঢাকা

প্রতিবেশীরা সাগরে জ্বালানি অনুসন্ধানে সফল, তীরে বসে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আরব সাগরের গভীরে চীনের সহায়তায় বিপুল গ্যাসের মজুদ পেয়েছে পাকিস্তান। প্রতিবেশী ভারতও অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আবিষ্কার করেছে তেল-গ্যাসের বিশাল ভান্ডার। এক দশক আগেই বঙ্গোপসাগরে গ্যাস তুলে চীনে রপ্তানি শুরু করেছে মিয়ানমার। তিন প্রতিবেশী দেশ যখন সমুদ্রবক্ষে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করছে, বাংলাদেশ তখনো তীরে বসে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির এক যুগের বেশি সময় পার হলেও বিশাল জলসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো সাফল্য নেই। উল্টো আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেও বিদেশি কোম্পানির সাড়া মিলছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে দেশের সমুদ্রের বিপুল সম্পদ অনুসন্ধানে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। গত বছরের মার্চে ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো বিদেশি কোম্পানির সাড়া না মেলা এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করেছে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পরই মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষে ‘শোয়ে’ গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে, যা এখন চীনে রপ্তানি হচ্ছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের ৩৫ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে বড় মজুদের সন্ধান পায়, যা দেশটির মোট গ্যাস উত্তোলনে ১৫ শতাংশ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানও আরব সাগরে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

প্রতিবেশীদের এই সাফল্যের বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। দেশে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে মোট ২৬টি ব্লক থাকলেও বর্তমানে কোনোটিতেই কার্যকর অনুসন্ধান কার্যক্রম নেই। এর আগে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস, অস্ট্রেলিয়ার স্যান্তোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ুর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এলেও গ্যাসের দামসহ নানা জটিলতায় একে একে ব্লক ছেড়ে চলে গেছে। সর্বশেষ ভারতীয় দুটি কোম্পানিও এক দশক কাজ করে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার মতো নীতির অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। গত বছরের মার্চে ডাকা দরপত্রে সাতটি বিদেশি কোম্পানি নথি কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউই দরপত্র জমা দেয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, “মিয়ানমার ও ভারতের আবিষ্কারস্থলের মাঝখানে বাংলাদেশের জলসীমায় গ্যাস পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমরা সঠিক সময়ে তৎপরতা দেখাতে পারছি না। যখন বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে চায়, তখন হয়তো আমরা প্রস্তুত থাকি না; আবার আমরা যখন প্রস্তুত হই, তখন তারা অন্য দেশে বিনিয়োগ করে ফেলে।”

পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পর্যালোচনায়, বিদেশি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের প্রতি অনাগ্রহের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো, গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত মুনাফার অংশ যথেষ্ট আকর্ষণীয় না হওয়া। এর পাশাপাশি, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অপরিহার্য বহুমাত্রিক জরিপের তথ্যে ঘাটতি এবং তেল-গ্যাস কোম্পানির কর্মীদের লভ্যাংশ তহবিল সংক্রান্ত জটিলতাগুলোও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের প্রতি যখন বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ, তখন ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে (আইওসি) টেনে নিচ্ছে। চলতি বছরেই এসব দেশের ডাকা দরপত্রে ব্যাপক সাড়া মিলেছে।

ব্যর্থতার কারণগুলো পর্যালোচনা করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের অনাগ্রহের কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রফিট শেয়ারিং, জরিপের তথ্য ও ডব্লিউপিপিএফ-এর মতো বিষয়গুলো সংশোধন করে খুব দ্রুতই আমরা পুনরায় দরপত্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলেই হয়তো এ বছরের মধ্যেই নতুন দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু দরপত্র ডাকলেই হবে না, আমদানির সহজ পথ থেকে সরে এসে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। নইলে বিশাল সমুদ্রসীমা কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়বে পরনির্ভরতা।

পাঠকপ্রিয়