গাজার আকাশ যখন ইসরায়েলি বোমারু বিমানের শব্দে কাঁপে, তখন মাটির পৃথিবীতে আরেক নীরব, কিন্তু আরও ভয়াবহ যুদ্ধ চলে—ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইসরায়েলি অবরোধের ফাঁস যখন গাজার মানুষের গলায় শক্ত হয়ে বসেছে, তখন সেখানে এক চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, যা দুর্ভিক্ষের নামান্তর। এই পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য গাজার মানুষ যা করছে, তা শুধু অকল্পনীয়ই নয়, বরং মানুষের সহনশীলতা এবং সৃজনশীলতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এই কঠিন বাস্তবতার কথাই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন গাজার বাসিন্দা, ইংরেজি ভাষার গল্পকার ও স্বেচ্ছাসেবক দিমা ফায়্যাদ। তাঁর নিজের এবং তাঁর পরিবারের অভিজ্ঞতার বয়ান যেন পুরো গাজার সম্মিলিত আর্তনাদ।
অবরোধের কালো ছায়া ও খাদ্যের লড়াই
ইসরায়েলের সর্বাত্মক অবরোধ গাজাকে একটি খোলা কারাগার বানিয়ে দিয়েছে, যেখানে খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং জ্বালানির মতো মৌলিক চাহিদাগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাজারের তাকগুলো শূন্য, কৃষিজমিগুলো বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত অথবা প্রবেশাধিকারহীন। ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষায়, যার সামান্য অংশই ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছায়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রতিটি পরিবারকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে: সামান্য যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে কীভাবে যতটা সম্ভব বেশি দিন টিকে থাকা যায়। দিমা ফায়্যাদ এবং তার পরিবারও এই বাস্তবতার শিকার। তাদের রান্নাঘর পরিণত হয়েছে এক পরীক্ষাগারে, যেখানে নিত্যনতুন ‘নকল’ খাবারের রেসিপি তৈরি হচ্ছে—বেঁচে থাকার তাগিদে।
দিমা বলেন, “আমাদেরকে এমন কিছু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে, যা আমরা সুস্থ সময়ে কখনো কল্পনাও করতে পারতাম না। প্রতিটি দিনই ছিল এক নতুন চ্যালেঞ্জ। আজ যা দিয়ে রান্না হচ্ছে, কাল হয়তো তা থাকবে না। তাই আমাদের প্রতিটি উপাদানকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে হয়েছে। এই উদ্ভাবনগুলো কোনো শৌখিন রান্না ছিল না, এগুলো ছিল আমাদের টিকে থাকার বর্ম।”

রুটির জন্য হাহাকার: পাস্তা থেকে মসুর ডাল
ফিলিস্তিনি সংস্কৃতিতে রুটি, বা ‘খুবজ’, কেবল একটি খাবার নয়, এটি জীবনের প্রতীক। সকালের নাশতা থেকে রাতের খাবার, সবকিছুতেই রুটি অপরিহার্য। কিন্তু গমের আটার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজার ঘরে ঘরে রুটি বানানো বন্ধ হয়ে যায়। এই সংকট মোকাবেলায় মানুষ এক অবিশ্বাস্য সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে: পাস্তা দিয়ে রুটি তৈরি।
শুরুতে ধারণাটা অদ্ভুত শোনালেও, খুব দ্রুতই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ বাজারে ফল, সবজি, ডিম, মাংস কিছুই যখন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ত্রাণে পাওয়া পাস্তাই ছিল অনেকের একমাত্র সম্বল। মানুষের যুক্তি ছিল, পাস্তা রান্না করে খেলে তা কেবল একবেলার খাবার, কিন্তু রুটি বানাতে পারলে তা প্রতিটি খাবারের সঙ্গে খাওয়া যায় এবং পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে।
গত জুনের শুরুতে দিমা ফায়্যাদের পরিবার প্রথমবার পাস্তার রুটি বানানোর চেষ্টা করে। দিমা’র ভাই ফাদির স্ত্রী দোহা তার পরিবারের কাছ থেকে এই অভিনব রেসিপিটি শেখেন, কারণ তারা বেশ কিছুদিন ধরেই এটি খাচ্ছিলেন। দিমা’র মা সাহামের সহায়তায় দোহা রুটি বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রথমে পাস্তাগুলোকে দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজিয়ে নরম করা হয়। এরপর সামান্য পরিমাণ গমের আটা, যা তখনও অবশিষ্ট ছিল, তার সঙ্গে মিশিয়ে একটি আঠালো মণ্ড তৈরি করা হয়। এই মণ্ড তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ, যার জন্য প্রয়োজন ছিল অমানুষিক ধৈর্য আর শক্তি।
মণ্ড তৈরি হওয়ার পর, দিমা’র ৩৫ বছর বয়সী ভাই ফাদি সেই রুটি নিয়ে যান স্থানীয় মসজিদের গণচুলায়। সেখানে তখন মানুষের দীর্ঘ সারি। প্রত্যেকের হাতেই পাস্তার মণ্ড। ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট অপেক্ষার পর ফাদির পালা আসে। রুটি সেঁকে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন সবাই অবাক হয়ে দেখেন, দেখতে তা সাধারণ রুটির মতোই এবং স্বাদও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। প্রথম কয়েকদিন এই ‘নকল’ রুটি তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছিল।
কিন্তু এই সমাধানও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পাস্তার রুটির চাহিদা বাড়তে থাকায় বাজার থেকে পাস্তাও উধাও হতে শুরু করে এবং এর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়, ঠিক যেমনটা গমের আটার ক্ষেত্রে হয়েছিল। জুলাই মাসের মধ্যে দিমা’র পরিবারের মতো অনেক পরিবারই আর পাস্তা কেনার সামর্থ্য রাখছিল না।
তারা আবার এক নতুন বিকল্পের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে। এবার তাদের নজর পড়ে মসুর ডালের ওপর। ফাদির এক বন্ধু তাকে মসুর ডাল দিয়ে রুটি বানানোর একটি উপায় বাতলে দেয়। ফাদি বাজার থেকে মসুর ডাল কিনে মেশিনে গুঁড়ো করে আটার মতো বানান। এরপর পাস্তার রুটির মতোই সামান্য গমের আটার সঙ্গে মিশিয়ে মণ্ড তৈরির চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু মসুর ডালের মণ্ড তৈরি করা ছিল পাস্তার চেয়েও বহুগুণ কঠিন। এর আঠালো ভাব প্রায় ছিলই না। দিমা এবং তার মা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করে কোনোমতে মণ্ডটি তৈরি করেন। কিন্তু চুলা থেকে আসার পর সেই রুটির স্বাদ ছিল ভয়ংকর। এটি রুটির চেয়ে বেশি ডালের মতো স্বাদের ছিল এবং খেতে অস্বাভাবিক শক্ত।

দিমা সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমরা খাওয়ার সময় ডালের অদ্ভুত স্বাদটা উপেক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। প্রতিটি কামড় ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। তবুও আমাদের খেতে হয়েছে, কারণ টেবিলে আর কিছুই ছিল না। পরের দিন সেই রুটি আরও শুকিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল যেন গলায় পাথর আটকে যাচ্ছে।”
এই শক্ত রুটি খাওয়ার জন্য তারা ‘দুক্কাহ’ ব্যবহার শুরু করে। দুক্কাহ হলো ভাজা গম এবং বিভিন্ন মশলা (যেমন ধনিয়া ও শুলফা) পিষে তিলের সঙ্গে বানানো একটি মিশ্রণ, যা সাধারণত রুটির সঙ্গে খাওয়া হয়। কিন্তু বিড়ম্বনা হলো, এই দুঃসময়ে দুক্কাহ বানানোর জন্যও গমের বদলে মসুর ডালই ব্যবহার করা হচ্ছিল। অর্থাৎ, তারা মসুর ডালের রুটি খাচ্ছিল মসুর ডালের দুক্কাহ দিয়ে। এই পুনরাবৃত্তি ছিল তাদের সীমিত খাদ্য তালিকার এক করুণ বাস্তবতা।
নকল বার্গার ও হারানো দুপুরের খাবার
একদিন দিমা দেইর আল-বালাহ’র একটি আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শেষে তার বোন ফিদার সঙ্গে দেখা করতে যান। ৩৭ বছর বয়সী ফিদা, যিনি একজন ওয়াশ অফিসার, তার চার সন্তান—বাসমা, ওয়ার্দ, আসেম এবং ওমরকে নিয়ে খান ইউনিসের বাড়ি ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছিলেন।
দিমা যখন বোনের ঘরে পৌঁছান, তিনি দেখেন ফিদা একটি ছোট রান্নার জায়গায় ক্যানের মাংস এবং মসুর ডাল দিয়ে ‘নকল’ বার্গার তৈরির চেষ্টা করছেন। স্থানীয় একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে তিনি এই রেসিপিটি পেয়েছিলেন। দিমাও তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান।
কিন্তু প্যাটিগুলো কিছুতেই আকার নিচ্ছিল না। ক্যানের মাংস ছিল সরাসরি খাওয়ার জন্য প্রক্রিয়াজাত, রান্না করার জন্য নয়। ভাজতে গেলেই সেগুলো ভেঙে যাচ্ছিল। মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জন্য তারা কিছু মশলা যোগ করেন। যেহেতু বার্গারের বান ছিল না, তাই সাধারণ ফ্ল্যাটব্রেডের ওপর শসার টুকরো দিয়ে স্যান্ডউইচের মতো করে বানানো হয়। বাচ্চারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল এক ভিন্নধর্মী দুপুরের খাবারের জন্য।
প্রথম কামড়ে স্বাদটা মন্দ লাগেনি, হয়তো তীব্র ক্ষুধার কারণে। কিন্তু পর পর কয়েক কামড় দেওয়ার পরই মাংসের কৃত্রিম স্বাদ এবং ডালের মিশ্রণ মুখে বিতৃষ্ণা তৈরি করে। তবুও সেদিন সব বার্গার শেষ হয়েছিল। কারণ, তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না। ফিদার সন্তানেরা হয়তো বার্গারের নামে অন্য কিছু একটা খেল, কিন্তু তাদের চোখ খুঁজছিল সত্যিকারের মাংসের স্বাদ, যা তাদের শৈশব থেকে হারিয়ে গেছে।

নকল নাশতায় এক টুকরো আনন্দ খোঁজার চেষ্টা
যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষের মন থেকে ছোট ছোট আনন্দগুলো কেড়ে নেয়। বিকেলের নাশতা বা সকালের মিষ্টিমুখ—এগুলো এখন গাজাবাসীর কাছে স্বপ্নের মতো। এই শূন্যতা পূরণ করতে দিমা’র পরিবার কিছু নকল নাশতা তৈরির চেষ্টা শুরু করে।
যুদ্ধের আগে তারা ত্রাণ হিসেবে মাঝে মাঝে হালুয়া পেত। দিমা’র ভাবি দোহা একদিন সেই হালুয়া দিয়ে একটি চকলেট স্প্রেড তৈরি করার চেষ্টা করেন। হালুয়া, যা মূলত তিলের পেস্ট (তাহিনি) এবং চিনি দিয়ে তৈরি, গাজার একটি জনপ্রিয় মিষ্টি। দোহা প্রথমে হালুয়ার সঙ্গে পানি মিশিয়ে তা তরল করেন, এরপর তাতে কোকো পাউডার মিশিয়ে জ্বাল দেন। এতে হালুয়ার মূল স্বাদ কিছুটা থাকলেও কোকোর কারণে তা চকলেটের মতো মনে হচ্ছিল। তারা বেশ আনন্দের সঙ্গেই কয়েকদিন সকালে রুটির সঙ্গে এই স্প্রেড দিয়ে স্যান্ডউইচ বানিয়ে খান। কিন্তু কোকো পাউডার ফুরিয়ে গেলে সেই আনন্দের অধ্যায়ও শেষ হয়ে যায়।
নোনতা নাস্তার জন্য তারা ম্যাকারনি তেলে ভেজে তাতে লবণ ও মশলা ছিটিয়ে ‘নকল’ চিপস বানাত। আর বাদামের বিকল্প হিসেবে তাদের এক প্রতিবেশী ছোলা ভেজে মশলা মিশিয়ে খাওয়ার বুদ্ধি দেন। গাজায় বাদাম খুব জনপ্রিয় একটি নাশতা। কিন্তু ছোলা দিয়ে বাদামের স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। এছাড়াও, এই নাশতাগুলো তৈরি করা সহজ ছিল না। খোলা আগুনে রান্না করতে হতো, কারণ গ্যাস বা বিদ্যুৎ ছিল না। এতে প্রচুর সময় ও পরিশ্রম লাগত এবং আগুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করত।
দিমা বলেন, “আমরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে মজা করে বলি, আমাদের খাবারের মেন্যুতে কত বৈচিত্র্য! কিন্তু আসলে সবকিছুই এক জিনিস দিয়ে তৈরি—পাস্তা, ছোলা আর সবচেয়ে বেশি মসুর ডাল।”

খিদের ক্ষতিপূরণ: এক মানবিক দাবি
ত্রাণে পাওয়া ডাল, পাস্তা বা টিনজাত খাবারগুলো গাজার মানুষকে হয়তো মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, কিন্তু এগুলো তাদের শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে। বর্তমানে এই ত্রাণসামগ্রীগুলোও অপ্রতুল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
দিমা’র বোন মরিয়ম বলেন, “আমাদের হয়তো পাস্তা আর ডালের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, কারণ এগুলো আমাদের বিকল্প খাবার তৈরি করতে শিখিয়েছে।” কিন্তু এই কৃতজ্ঞতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনা ও ক্ষোভ।
দিমা ফায়্যাদ তাঁর লেখার শেষে এক মর্মস্পর্শী দাবি তুলে ধরেন—ক্ষতিপূরণের দাবি। এই ক্ষতিপূরণ আর্থিক নয়, বরং মানবিক। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, আমাদের ক্ষতিপূরণ দরকার। যখন এই ভয়ানক অবরোধ শেষ হবে, আমি সবকিছু খেতে চাই—কেবল সেই সব বাদে, যা এই দুঃসময়ে আমাদের খেতে বাধ্য করা হয়েছে।”
তিনি সেই প্রতিটি মুহূর্তের জন্য ক্ষতিপূরণ চান, যখন তার ক্ষুধায় মাথা ঘুরেছে, কিন্তু তিনি ফল, সবজি, ডিম বা এক টুকরো মুরগির মাংস চেয়েও পাননি। তিনি সেই প্রতিটি খাবারের সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ চান, যখন তার প্লেটে মসুর ডাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই দাবি শুধু দিমা’র একার নয়, এটি গাজার প্রতিটি শিশুর, প্রতিটি মায়ের, প্রতিটি ক্ষুধার্ত মানুষের দাবি। এটি হারানো শৈশবের দাবি, হারানো স্বাদের দাবি এবং সর্বোপরি, হারানো মানবিক মর্যাদার দাবি। গাজার মানুষ শুধু বেঁচে নেই, তারা তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য এক অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে এক টুকরো রুটির স্বপ্ন দেখাটাও এখন বিলাসিতা।