সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

১০ হাজার কোটির কর্ণফুলী টানেল, তবু নেই প্রত্যাশার গাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুড়ঙ্গপথটি দেশের প্রকৌশলগত এক বিশাল অর্জন। কিন্তু উদ্বোধনের দুই বছর পরও এই টানেল যেন প্রত্যাশার তুলনায় বড় বেশি ফাঁকা। যে সুড়ঙ্গপথ ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই ‘কর্ণফুলী টানেল’ এখন আশানুরূপ গাড়ি না পেয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গ।

২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর থেকে এই বছরের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত, অর্থাৎ দুই বছরে, প্রতিদিন গড়ে গাড়ি চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭০টি। অথচ, টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রক্ষেপণ ছিল, ২০২৫ সাল নাগাদ দিনে গাড়ি চলবে ১৯ হাজার ৬৬৯টি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার গাড়ি কম চলায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সুবিশাল বিনিয়োগের সুফল মিলবে কবে?

টানেল পার হয়ে আনোয়ারা প্রান্তে নামার পর গাড়িগুলো পড়ছে সংযোগ সড়কের জটেই। কক্সবাজার বা দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য যে মসৃণ নেটওয়ার্ক থাকার কথা ছিল, তার অভাবেই চালকরা এই রুট ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এই বাস্তবতায়, টানেল প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এখন টানেলকে ‘কাজে লাগাতে’ নতুন দুটি বড় সড়ক প্রকল্পের জন্য জোর তদবির শুরু করেছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান বাজিটি হলো ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ’। এই মেগা-প্রকল্পের আওতায় মিরসরাই শিল্পনগর থেকে আনোয়া-বাঁশখালী হয়ে পেকুয়া-মাতারবাড়ী দিয়ে একেবারে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপকূলীয় সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে, যাতে খরচ ধরা হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিপুল অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। সেতু কর্তৃপক্ষ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে চিঠি দিয়ে এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে বলেছে।

তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে সওজ আরেকটি ৪৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারার কালাবিবির দিঘির মোড় থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমানে এই সড়কটি মাত্র সাড়ে ৫ মিটার প্রশস্ত, যা বাড়িয়ে সাড়ে ১০ মিটার করা হবে। সওজের চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, এতে কক্সবাজারের দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার কমবে এবং সময় বাঁচবে অন্তত আধা ঘণ্টা। তবে এই প্রকল্পটিও এখনো পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি, কিছু সংশোধনী দিয়ে তা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস মনে করেন, এই সংযোগ সড়কগুলো নির্মিত হলেই টানেলের আসল ব্যবহার শুরু হবে। তিনি জানান, মেরিন ড্রাইভের জন্য সওজকে এবং আনোয়ারা প্রান্তে নগর উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামও এই মেরিন ড্রাইভের ওপরই জোর দিচ্ছেন। তাঁর মতে, টানেলের পরিপূর্ণ ব্যবহারের চাবিকাঠি এটিই। বিশেষ করে মিরসরাই শিল্পাঞ্চল এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হলে এই মেরিন ড্রাইভ এবং টানেলের ব্যবহার বহুগুণ বাড়বে।

দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ করে বাংলাদেশ সক্ষমতার প্রমাণ দিলেও, সেই টানেলকে ঘিরে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই এখন স্পষ্ট। হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিশাল অবকাঠামো এখন যেন নিজেই তার ব্যবহারকারী খুঁজছে; অপেক্ষা করছে সেই স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ আর সংযোগ সড়কের, যা সত্যি হলে এই সুড়ঙ্গপথ আর ফাঁকা থাকবে না।

পাঠকপ্রিয়