ব্রঙ্কসের এক রাস্তার মোড়ে। হাতে প্ল্যাকার্ড। চারপাশে ক্লান্ত মানুষের ভিড়। কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো বড় মঞ্চ। আছে শুধু একজন তরুণের চোখে জ্বলজ্বল করা স্বপ্ন। এভাবেই নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন জোহরান মামদানি। যেন তিনি কোনো রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন দৃঢ়বিশ্বাসী ধর্মপ্রচারক, যিনি মানুষের কষ্টের কথা শুনতে এসেছেন।
আর সেই শোনার ভেতর দিয়েই লেখা হয়েছে এক অসাধারণ বিজয়ের গল্প। ৩৪ বছর বয়সী এক তরুণ, যিনি আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র হয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন। শুধু বয়সের কারণে নয়, বরং তাঁর জয় হয়ে উঠেছে এক নতুন রাজনীতির ইশতেহার—যেখানে সাধারণ মানুষের কষ্টই মূল কথা, যেখানে বিলিয়নিয়ারদের টাকা নয়, বরং জনগণের স্বপ্নই আসল শক্তি।
বার্নি স্যান্ডার্সের ছায়ায় রাজনৈতিক জাগরণ
২০১৬ সাল। আমেরিকায় তখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক জোয়ার। একদিকে বার্নি স্যান্ডার্সের সমাজতান্ত্রিক বার্তা তরুণদের মনে আলোড়ন তুলছে, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্ষণশীল জনতুষ্টিবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক তরুণ খুঁজে পাচ্ছিলেন নিজের রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি জোহরান মামদানি।
স্যান্ডার্সের প্রচারণা তাঁকে দেখিয়েছিল, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতাসীনদের খেলা নয়। রাজনীতি হতে পারে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। স্যান্ডার্স যখন কথা বলতেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে, যখন দাবি করতেন সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার, তখন মামদানি বুঝতে পারলেন—এটাই তাঁর পথ। কিন্তু স্যান্ডার্স হারলেন। আর আমেরিকা পেল ট্রাম্পকে।
সেই পরাজয় মামদানিকে ভেঙে ফেলেনি। বরং শক্তি যুগিয়েছে। তিনি বুঝলেন, শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, স্থানীয় রাজনীতিতেই পরিবর্তন আনতে হবে। নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হলেন তিনি। শুরু হলো এক নতুন যাত্রা।
যখন বিলিয়নিয়াররা ভয় পেলেন
মামদানি যখন নিউইয়র্কের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল না কোটি কোটি টাকার তহবিল। ছিল না কোনো বিলিয়নিয়ারের পৃষ্ঠপোষকতা। তাঁর কাছে ছিল শুধু একটি বার্তা—নিউইয়র্ককে সাশ্রয়ী করতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য।
নগর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মুদিদোকান, বিনা মূল্যে গণপরিবহন, সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা—এসব প্রতিশ্রুতি শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন আমেরিকার ধনকুবেররা। মাইকেল ব্লুমবার্গ, বিল অ্যাকম্যান, লডার পরিবার—একের পর এক ধনী ব্যক্তি লাখ লাখ ডলার ঢেলে দিলেন মামদানির প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে।
মোট ২ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ করা হলো মামদানিকে হারাতে। কিন্তু তিনি দমলেন না। বরং এক জনসভায় বলে উঠলেন, “বিল অ্যাকম্যান এবং রোনাল্ড লডারের মতো ধনকুবেররা এই নির্বাচনে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছেন। কারণ তাঁরা বলেন, আমরা অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছি। আমি এখানে একটি কথা স্বীকার করছি—তাঁরা ঠিকই বলছেন।”
এই সাহসী উক্তি হয়ে উঠল তাঁর প্রচারের প্রতীক। মানুষ বুঝল, এই তরুণ কথা বলছেন তাদেরই ভাষায়।
শোনার শক্তি: যে গুণ বদলে দিল নির্বাচন
২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তখন অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু মামদানি কী করলেন? তিনি রাস্তায় নামলেন। গেলেন সেই সব মানুষের কাছে যারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন—কেন?
এই কথোপকথনগুলো ছিল অসাধারণ। কোনো বাগাড়ম্বর নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক ভান। মামদানি শুধু শুনছিলেন। মানুষের কষ্টের কথা, তাদের ক্ষোভের কথা। একজন বৃদ্ধ বলছেন, বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। আরেকজন বলছেন, গ্রোসারির দাম আকাশছোঁয়া। সবাই বলছেন একই কথা—রাজনীতিবিদেরা আমাদের বুঝতে চান না।
মামদানি বুঝলেন। আর সেই বোঝাপড়া থেকেই তৈরি হলো তাঁর প্রচারণার মূল ভিত্তি। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিকল্পনা। ধনীদের ওপর কর বসিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধা বাড়ানো।
যে বিজয় ইতিহাস গড়ল

নির্বাচনের রাতে যখন ফলাফল আসতে শুরু করল, তখন পুরো নিউইয়র্ক যেন থমকে গেল। মামদানি জিতছেন। ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাচ্ছেন। বিলিয়নিয়ারদের কোটি কোটি ডলার বৃথা গেল। জনগণ বেছে নিল তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিকে।
৮১ বছর বয়সী মার্গারেট কোগান বলেছিলেন, “মামদানির জয় ‘ঘুমিয়ে থাকা’ ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য একটি জাগরণের বার্তা।” ৩২ বছর বয়সী ডিলান, যিনি রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, তিনি বলেছেন মামদানির উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে আবার ভোট দিতে গিয়েছেন।
নিউইয়র্কের বাইরেও মানুষ উদযাপন করল। ইউটাহ থেকে টেনেসি, মিশিগান থেকে ফ্লোরিডা—সবখানে মানুষ বলছিল, “মামদানির জয় নির্মল বাতাসে নতুন করে শ্বাস নেওয়ার মতো।”
কেফিয়াস স্ট্রাচান (৫৪), টেনেসির বাসিন্দা, চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার ঘুম থেকে উঠে কোনো ভালো খবর পেয়েছেন।
যে শিক্ষা আমরা নিতে পারি
মামদানির জয় থেকে আমরা কী শিখতে পারি? প্রথমত, সততার শক্তি। তিনি কখনো ভান করেননি। নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছেন। যখন বিলিয়নিয়াররা তাঁকে “অস্তিত্বের হুমকি” বলেছেন, তিনি সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, তিনি লড়ছেন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যা সাধারণ মানুষকে পিষে ফেলে।
দ্বিতীয়ত, শোনার গুরুত্ব। আমরা অনেক সময় মানুষকে বোঝাতে চাই, কিন্তু তাদের কথা শুনতে ভুলে যাই। মামদানি মানুষের কথা শুনেছেন। তাদের বাস্তব সমস্যা বুঝেছেন। আর সেই বোঝাপড়া থেকেই তৈরি করেছেন তাঁর কর্মসূচি।
তৃতীয়ত, তৃণমূলের শক্তি। বড় বড় দাতা না থাকলেও, মামদানি তৈরি করেছেন এক শক্তিশালী গণআন্দোলন। রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত থেকেছেন তরুণদের সঙ্গে। তৈরি করেছেন এমন এক প্রচারণা যা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।
চতুর্থত, সাহসের প্রয়োজনীয়তা। ট্রাম্পের আমলে, যখন প্রগতিশীল রাজনীতি ক্রমাগত আক্রান্ত, তখন মামদানি দাঁড়িয়েছেন অকুতোভয়। তাঁকে “সন্ত্রাসবাদে সহানুভূতিশীল” বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি পিছপা হননি। নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছেন।
পঞ্চমত, স্পষ্ট বার্তার শক্তি। মামদানির প্রতিশ্রুতি ছিল সহজ ও সরল—জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাড়িভাড়া স্থিতিশীল রাখা, বিনা মূল্যে গণপরিবহন, সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা। জটিল রাজনৈতিক বুলি নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার কথা।
রামা দুয়াজি: পেছনের শক্তি

প্রতিটি সফল মানুষের পেছনে থাকে এক নীরব সমর্থক। মামদানির জন্য তিনি তাঁর স্ত্রী রামা দুয়াজি। ২৮ বছর বয়সী এই শিল্পী কখনো প্রচারের সামনে আসেননি, কিন্তু পেছনে থেকে তৈরি করেছেন প্রচারণার ভিজ্যুয়াল পরিচয়।
মেট্রোকার্ড কমলা-হলুদ, নিউইয়র্ক মেটস নীল, ফায়ারহাউস লাল—এই রঙের সংমিশ্রণ তৈরি করেছেন দুয়াজি। যে ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দেয় বোডেগা দোকানের সাইনবোর্ড। সবকিছুই নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুয়াজি নিজেও এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তাঁর শিল্পকর্ম আলোড়ন তোলে। তিনি দেখান, রাজনৈতিক সঙ্গী মানে শুধু ছায়া নয়, বরং নিজস্ব পরিচয় থাকা এক স্বাধীন ব্যক্তিত্ব।
যে চ্যালেঞ্জ সামনে অপেক্ষা করছে
মামদানি জিতেছেন, কিন্তু সামনে পড়ে আছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর পথে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে—এটা নিশ্চিত। জেপি মরগান চেজের সিইও জেমি ডিমন, যিনি মামদানিকে ‘সমাজতান্ত্রিকের চেয়ে বেশি মার্ক্সবাদী’ বলেছিলেন, তিনিও এখন যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী।
বিল অ্যাকম্যান, যিনি মামদানির বিরুদ্ধে ১৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার খরচ করেছিলেন, তিনি এখন লিখছেন, “আমি নিউইয়র্ক নগরকে সাহায্য করতে পারি। আমাকে শুধু জানাবেন, আমি কী করতে পারি।”
এই হঠাৎ বন্ধুত্বের প্রস্তাবগুলো কৌশলগত হতে পারে। মামদানিকে সতর্ক থাকতে হবে। তাঁকে মনে রাখতে হবে, তিনি কাদের প্রতিনিধি—সাধারণ মানুষের, যারা বাড়িভাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছে, যারা গ্রোসারির দাম নিয়ে চিন্তিত।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
বিজয় ভাষণে মামদানি বলেছিলেন, “যদি কেউ ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষতবিক্ষত একটি জাতিকে দেখাতে পারে কীভাবে তাকে পরাজিত করতে হয়, তবে সেই শহরই পারে, যে শহর ট্রাম্পকে তৈরি করেছিল।”
এই কথায় আছে গভীর আশাবাদ। নিউইয়র্ক, যে শহর একসময় ট্রাম্পকে গড়েছে, সেই শহরই এখন দেখাচ্ছে কীভাবে ট্রাম্পবাদকে পরাজিত করতে হয়। শুধু বিরোধিতা নয়, বরং বিকল্প উপস্থাপন করে।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি মামদানি দায়িত্ব নেবেন। তাঁর হাতে থাকবে বিশাল দায়িত্ব। কিন্তু সঙ্গে থাকবে লাখো মানুষের আশা। ৩৩ বছর বয়সী কিম্বারলি মাইকেল বলেছেন, “আমার বিশ্বাস, ভালো কিছু হবে। এখন যেটি দরকার, তা হলো আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা।”
যে আলো জ্বালালেন এক তরুণ
অন্ধকার সময়ে আলো জ্বালানো সহজ নয়। যখন চারপাশে হতাশা, যখন মনে হয় বদলানো অসম্ভব, তখন এক তরুণ দেখালেন—না, সম্ভব। জোহরান মামদানি প্রমাণ করেছেন, আদর্শে অটল থাকলে, মানুষের কথা শুনলে, সততার সঙ্গে লড়লে—জেতা যায়।
তাঁর জয় শুধু নিউইয়র্কের জয় নয়। এটা সেই সব মানুষের জয় যারা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। এটা সেই সব তরুণের জয় যারা ভাবছিলেন, তাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনবে না। এটা সেই সব স্বপ্নবাজদের জয় যারা বিশ্বাস করেন—আরও ভালো একটা পৃথিবী সম্ভব।
এখন দেখার পালা, মামদানি কীভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। পথ সহজ নয়, কিন্তু শুরুটা হয়েছে। আর সেই শুরুতেই আছে অসীম সম্ভাবনা। কারণ একজন তরুণ দেখিয়ে দিয়েছেন—যদি সাহস থাকে, যদি বিশ্বাস থাকে, যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা থাকে—তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। তাহলে স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য নতুন দিশা
মামদানির জয় শুধু নিউইয়র্কের জন্য নয়, পুরো ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য এক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্পের কাছে পরাজয়ের পর দলটি ছিল দিশাহারা। হোয়াইট হাউস হারিয়েছে, কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারিয়েছে, শ্রমজীবী ও তরুণ ভোটারদের একাংশ হারিয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৪৫ লাখ নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট ভোটার রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়েছেন।
এমন সংকটের মুহূর্তে মামদানির জয় একটা পথ দেখাল। ভার্জিনিয়ায় অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার এবং নিউ জার্সিতে মিকি শেরিলের জয়ের সঙ্গে মিলিয়ে এই তিনটি নির্বাচন প্রমাণ করল—জনগণের বাস্তব সমস্যার কথা বললে, জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের সমাধান দিলে, মানুষ ডেমোক্র্যাটদের আবার বিশ্বাস করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইমন বাজেলন ৫ লাখের বেশি ভোটারের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ডেমোক্র্যাটরা গণতন্ত্র, গর্ভপাত ও সাংস্কৃতিক ইস্যুতে খুব বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ চেয়েছিলেন জীবনযাত্রার খরচ, সীমান্তনিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা নিয়ে কথা শুনতে। মামদানি ঠিক সেই কাজটাই করেছেন।
তবে এখন দলের মধ্যে এক নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব কারা নেবেন—মামদানির মতো বামপন্থীরা, নাকি মধ্যপন্থীরা? রিপাবলিকান কৌশলবিদ ম্যাট গোরম্যান বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের অর্থ ও শক্তি এখন বামপন্থী ঘরানার দিকে ঝুঁকেছে।
প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব
মামদানির জয়ে বিশেষভাবে উৎফুল্ল তরুণ প্রজন্ম। ৩২ বছর বয়সী ডিলান, যিনি রাজনীতিতে আগ্রহ হারাচ্ছিলেন, তিনি মামদানির প্রচারে মুগ্ধ হয়ে আবার ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা আমেরিকাজুড়ে তরুণরা মামদানির মধ্যে দেখছেন নিজেদের প্রতিফলন।
জেন জেড প্রজন্মের প্রথম সদস্য হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হওয়া মামদানি বুঝতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম—সব জায়গায় তাঁর উপস্থিতি ছিল সক্রিয়। কিন্তু শুধু অনলাইনে নয়, রাস্তায়ও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। এই দুই জগতের সংমিশ্রণ তাঁকে করে তুলেছিল অপ্রতিরোধ্য।
স্ত্রী দুয়াজি, যিনি নিজেও জেন জেড প্রজন্মের, তৈরি করেছেন এমন ভিজ্যুয়াল ভাষা যা তরুণদের কাছে সহজেই পৌঁছায়। মেট্রোকার্ডের রঙ, বোডেগার সাইনবোর্ড—এসব নিউইয়র্কের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আর এই পরিচিত উপাদান দিয়েই তৈরি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয়।
ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত প্রতিরোধ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যখন মধ্যপন্থী ও মধ্য-বাম রাজনীতিকরা হতবিহ্বল, তখন মামদানি দেখিয়েছেন কীভাবে লড়তে হয়। শুধু বিরোধিতা নয়, বিকল্প উপস্থাপন করে। ট্রাম্প যেখানে ভয় ও বিভাজন বিক্রি করেন, মামদানি সেখানে আশা ও ঐক্যের বার্তা দেন।
গার্ডিয়ানের কলামিস্ট আদিত্য চক্রবর্তী লিখেছেন, “মামদানিই প্রথম বামপন্থী রাজনীতিক, যিনি দেখিয়েছেন ট্রাম্পবাদের মুখোমুখি দাঁড়ানোই শুধু নয়, সেটিকে পরাজিত করাও সম্ভব।” এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ট্রাম্পবাদকে হারাতে হলে জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থার বিপরীতে চাই জনমুখী বামপন্থা।
ট্রাম্প টানেন দেশকে জাতিগত বিভাজনের দিকে। মামদানি দাঁড়ান অভিবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের পাশে। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন দাম কমানোর, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। মামদানি দেন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা—কীভাবে ধনীদের ওপর কর বসিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধা বাড়ানো যায়।
মুসলিম পরিচয় ও নতুন আমেরিকা
মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র। এই পরিচয় তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জও এনেছে। নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে নিয়মিত “সন্ত্রাসবাদে সহানুভূতিশীল” বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। প্রভাবশালী ডানপন্থীরা তাঁকে আইএসের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু নিউইয়র্কের ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করেছেন এই বিভাজনের রাজনীতি। তাঁরা মামদানিকে বিচার করেছেন তাঁর কর্মসূচি দিয়ে, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে—ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়। এটাই নতুন আমেরিকার ছবি। যেখানে বৈচিত্র্য শক্তি, দুর্বলতা নয়।
ভারতের মুসলিমরা মামদানির জয়ে খুশি হয়েছেন। তাঁরা দেখছেন, একজন মুসলিম তরুণ কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র হতে পারেন। এটা শুধু মামদানির জয় নয়, এটা বিশ্বজুড়ে সংখ্যালঘুদের জন্য এক আশার বার্তা।
বাস্তবতার মুখোমুখি
তবে রোমান্টিকতার বাইরেও বাস্তবতা আছে। কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মামদানির অনেক প্রতিশ্রুতি “অবাস্তব” কিনা। ৭১ বছর বয়সী ব্রুস ওয়েকস বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো উপায়ে মামদানির পথে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
এটা সত্য। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়া সহজ নয়। এটা বিশ্বের অন্যতম জটিল শহর। ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের ঘর। অসংখ্য সমস্যা—গৃহহীনতা, অপরাধ, যানজট, দূষণ। আর ওপর থেকে আছে ট্রাম্প প্রশাসনের শত্রুতা।
কিন্তু মামদানি এসব জেনেই এগিয়েছেন। তিনি কখনো বলেননি সবকিছু রাতারাতি বদলে যাবে। তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল—চেষ্টা করা। লড়াই করা। সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। আর সেই প্রতিশ্রুতিই মানুষের আস্থা জিতেছে।
যে উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান
জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মামদানি ভাবছেন তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে। তিনি চান নিউইয়র্ককে এমন এক শহর হিসেবে গড়তে যেখানে সবার জন্য বেঁচে থাকা সম্ভব। যেখানে শিল্পী, শিক্ষক, নার্স—সবাই সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন।
তাঁর বেবি বাস্কেট প্রস্তাবনা—নবজাতক ও তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ—দেখায় তিনি ভাবছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। বিনা মূল্যে গণপরিবহনের প্রস্তাব দেখায়, তিনি বুঝতে পারেন কীভাবে যাতায়াত খরচ মানুষের বাজেটে গর্ত করে।
সর্বজনীন শিশু পরিচর্যার প্রতিশ্রুতি দেখায়, তিনি জানেন কাজ করা বাবা-মায়েরা কী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যান। আর নগর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মুদিদোকানের প্রস্তাব দেখায়, তিনি বুঝেছেন বেসরকারি খাত সবসময় জনগণের স্বার্থ দেখে না।
শেষ কথা: একটি শুরু, শেষ নয়
জোহরান মামদানির গল্প এখনো লেখা হচ্ছে। তাঁর আসল পরীক্ষা শুরু হবে জানুয়ারিতে, যখন তিনি সিটি হলে বসবেন। তখন দেখা যাবে, প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পারেন। তখন বোঝা যাবে, তিনি কি সত্যিই আলাদা, নাকি আরেকজন রাজনীতিবিদ যিনি ক্ষমতা পেয়ে বদলে যাবেন।
কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। মামদানি দেখিয়েছেন, প্রগতিশীল রাজনীতি জিততে পারে। দেখিয়েছেন, সততা ও সাহস এখনো কাজে লাগে। দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালে তাঁরাও আপনার পাশে দাঁড়ান।
নিউইয়র্কের বাসিন্দা কেইথ অ্যালান ওয়াটস বলেছিলেন, “যেন বহুদিন ধরে লাখ লাখ মানুষ তাঁদের শ্বাস আটকে রেখেছিলেন।” এখন তাঁরা শ্বাস নিতে পারছেন। এখন তাঁরা আশা করতে পারছেন। আর সেই আশাই হয়তো সবচেয়ে বড় উপহার যা একজন রাজনীতিবিদ তাঁর জনগণকে দিতে পারেন।
মামদানির যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবর্তন সম্ভব। হতাশার অন্ধকারেও আলো জ্বালানো যায়। আর সেই আলো জ্বালাতে লাগে শুধু একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করেন এবং সাহস রাখেন দাঁড়ানোর।