দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে কক্সবাজার র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নে নজিরবিহীন রদবদল সংঘটিন হয়েছে। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) থেকে শুরু করে তিন শতাধিক সদস্যকে একযোগে বদলি করার ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে ‘নির্বাচনী প্রস্তুতি’ বা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে প্রচার করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা ইয়াবা আত্মসাৎ, জব্দ তালিকায় গরমিল এবং সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতে এই গণবদলির ঘটনাটি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্দরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
র্যাব সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক চারটি প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯ নভেম্বর দুটি এবং ২৭ নভেম্বর একটিসহ মোট চারটি ভিন্ন আদেশে র্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের প্রায় ছয় শতাধিক সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে কক্সবাজারের র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নে। এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানসহ প্রায় তিন শতাধিক সদস্যকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কামরুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নতুন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নেয়ামুল হালিম খান।
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী এই রদবদলকে আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক রুটিন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, র্যাব-১৫ তাদের সবচেয়ে বড় ব্যাটালিয়ন, তাই নির্বাচনের আগে সেখানে বড় ধরনের রদবদল স্বাভাবিক। এছাড়া প্রতিবছর নভেম্বরে সন্তানদের স্কুলের পরীক্ষা শেষে সদস্যদের সুবিধার্থে এক ব্যাটালিয়ন থেকে অন্য ব্যাটালিয়নে বদলি করা হয়, যাতে তারা নতুন জায়গায় পরিবার নিয়ে গুছিয়ে নিতে পারেন।
কিন্তু র্যাবের এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরেও বদলির পেছনে ভিন্ন কারণ থাকার জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে র্যাব-১৫ এর বেশ কয়েকটি মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগের তীর এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে, র্যাব সদরদপ্তরকে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে অন্তত দুটি অভিযানে বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে এবং অন্তত ১৫ জন র্যাব সদস্যের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বদলি হওয়া সদস্যদের তালিকায় এই অভিযুক্তরাও রয়েছেন। র্যাবের মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীও স্বীকার করেছেন যে, মাদকের অনিয়মসংক্রান্ত একটি তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং এতে যাদের নাম আসবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে গত ৭ সেপ্টেম্বর। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং পশ্চিম পাড়ায় এক অভিযানে দুই নারীকে আটক করে র্যাব। সরকারিভাবে দেখানো হয় ৮৯ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা এবং ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৮৩০ টাকা উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ ছিল আরও অনেক বেশি। প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ইয়াবা গোপন করার অভিযোগ ওঠে অভিযানকারী দলের বিরুদ্ধে।
এখানেই শেষ নয়, এই মামলার এজাহারে স্থানীয় যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিনের সহযোগী সেলিম উদ্দিনের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে ‘ভুল তথ্যের’ ভিত্তিতে স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম উদ্দিনকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিক সেলিম উদ্দিন দাবি করেন, প্রকৃত মাদক কারবারি সেলিমকে রক্ষা করতেই নামের মিল ব্যবহার করে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নভেম্বরের শুরুতে র্যাব সদরদপ্তরের তদন্ত দল সরেজমিন পরিদর্শনও করে।
অনিয়মের আরেকটি দৃষ্টিকটু উদাহরণ সৃষ্টি হয় ২৬ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায়। সেখানে শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৫। কিন্তু একজন শীর্ষ মাদক কারবারির কাছ থেকে জব্দ তালিকায় দেখানো হয় কেবল ৭টি ইটের টুকরো এবং দুটি কাঠের লাঠি। এই অস্বাভাবিক জব্দ তালিকা স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এই ঘটনাগুলোই মূলত র্যাব সদরদপ্তরকে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য করে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কক্সবাজারের মতো মাদকপ্রবণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় র্যাবের মতো এলিট ফোর্সের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা চুরির অভিযোগ বা নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানসহ পুরো টিমকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে র্যাব সদরদপ্তর হয়তো সেই ড্যামেজ কন্ট্রোলেরই চেষ্টা করেছে। তবে, কেবল বদলিই শাস্তি হতে পারে না। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেই কেবল বাহিনীর ওপর জনআস্থা অটুট থাকবে।