ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এবারের নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং চ্যালেঞ্জিং। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়, একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোটও।
কমিশনের অন্দরমহলের খবর, রোববার, ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভায় তফসিলের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। এই বৈঠকেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন ও অন্য কমিশনাররা। তবে তফসিল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতার আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথাগত রীতি পালন করবে কমিশন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, তফসিল ও গণভোট নিয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎ চেয়ে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সাগর হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট কমিশনের অনুরোধে সাড়া দিয়েছেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় বঙ্গভবনে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্রপতির গ্রিন সিগন্যাল মিললেই পরদিন, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করতে পারে ইসি।
তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ও চ্যালেঞ্জ হলো ‘ডাবল ভোট’। একই দিনে সংসদ সদস্য নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজন করতে গিয়ে সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কমিশনকে। গত চার দশকের ইতিহাসে ভোটগ্রহণ সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে এসেছে। কিন্তু এবার সেই প্রথা ভাঙার পরিকল্পনা চলছে। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘মক ভোটিং’ বা মহড়া ভোটে দেখা গেছে, একজন ভোটারকে দুই ধরনের ব্যালটে ভোট দিতে গিয়ে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই ভোটের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবনা বিবেচনা করছে কমিশন। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে মোট ৯ ঘণ্টা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সকাল ৮টার পরিবর্তে সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু করে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চালানোর চিন্তা চলছে। পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকক্ষে গোপন বুথের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং অতিরিক্ত সিল দেয়ার ব্যবস্থা করে ভোটারদের ভোগান্তি কমানোর কৌশল নিচ্ছে ইসি। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, একই দিনে দুই ভোট আয়োজন সময় ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় পরীক্ষা, তবে মানুষের ভোগান্তি যাতে না বাড়ে, সেদিকেই তাদের সর্বোচ্চ নজর।
এদিকে মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতিতেও কোনো ঘাটতি রাখছে না ইসি। প্রায় ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্র ও ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের জন্য ছাপানো হচ্ছে ২৫ কোটি ৫৪ লাখ ব্যালট পেপার। সরকারি প্রেসে সাধারণ ব্যালট এবং আর্মি সিকিউরিটি প্রেসে প্রবাসী ভোটের ব্যালট ছাপানোর কাজ চলছে পুরোদমে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ নিশ্চিত করেছেন, সিনিয়র সচিবদের সরাসরি তদারকিতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে এবং নিবন্ধিত ভোটারের চেয়ে একটিও বেশি ব্যালট যাতে না ছাপানো হয়, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আগামী বছরের ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একদিন দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কমিশন। এখন শুধু ১১ ডিসেম্বরের অপেক্ষা, যেদিন পর্দা উঠবে এই মহাযজ্ঞের।