সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ৫৪ বিদেশ সফরের নেপথ্য কাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের মাটিতে তিনি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী, কিন্তু তার আসল ‘জমিদারি’ গড়ে উঠেছিল হাজার মাইল দূরে—লন্ডন, দুবাই কিংবা নিউইয়র্কের অভিজাত সব মহল্লায়। সরকারি নথিতে তিনি সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী। কিন্তু ইমিগ্রেশন আর পাসপোর্টের পাতায় তিনি ছিলেন এক বিশ্বপরিব্রাজক। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল—এই দশ বছরে মোট ৫৪ বার তিনি বিমানে চেপেছেন। এর মধ্যে সরকারি সফর ছিল মাত্র তিনটি, বাকি ৫১টিই ব্যক্তিগত। এই বিপুল সংখ্যক বিদেশ ভ্রমণের নেপথ্যে কি শুধুই ভ্রমণপিপাসা ছিল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল হাজার কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য দেখভালের গোপন মিশন? দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে আসা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পাসপোর্ট বলছে, তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। ব্যক্তিগত সফরের তালিকায় নয়বারই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, উদ্দেশ্য পবিত্র ওমরাহ পালন। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত—বছরের পর বছর তিনি মক্কা-মদিনায় গেছেন। সঙ্গী হিসেবে প্রায়শই ছিলেন স্ত্রী রুখমীলা জামান। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, এই ‘ধর্মীয় সফরের’ আড়ালে ছিল ভিন্ন এক নকশা। সৌদি আরবের পাশাপাশি তার নিয়মিত গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুবাইয়ের চকচকে শহরে হাজার কোটি টাকার হুন্ডি কারবার আর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার তদারকি করতেই কি এই ঘন ঘন মধ্যপ্রাচ্য গমন? এই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। কারণ, ওমরাহ পালনের আগে বা পরে তার রুট ম্যাপে প্রায়ই যুক্ত হতো দুবাই বা লন্ডন।

মন্ত্রীর অফিশিয়াল ব্যয়ের হিসাব বলছে, এই সফরগুলোর পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ ৯২ হাজার ৭৫১ টাকা। সরকারি খরচে তিনি যুক্তরাজ্য, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সফরের তালিকাটি যেন বিশ্বভ্রমণের ডায়েরি—থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফ্রান্স এমনকি আইসল্যান্ডও বাদ যায়নি। তবে এসবের মধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর কাছে ‘দ্বিতীয় ঘর’ হয়ে উঠেছিল যুক্তরাজ্য। স্ত্রী রুখমীলা জামানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশিবার পাড়ি জমিয়েছেন লন্ডনে। দুদকের অনুসন্ধান বলছে, এই লন্ডন শহরেই তিনি গড়ে তুলেছেন তার অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পরই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। এরপরই একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে থলের বিড়াল। দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির যৌথ অনুসন্ধানে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ কেনা সংক্রান্ত ১১০০ নথির হদিস মিলেছে। এসব নথিতে যে সম্পদের বিবরণ রয়েছে, তার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দুবাইয়ে হুন্ডির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। আর সেই টাকায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ের মতো দেশে কিনেছেন বাড়ি, গাড়ি এবং গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাবেক এই মন্ত্রীর বিদেশে মোট ৫৮১টি ফ্ল্যাট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল যুক্তরাজ্যেই রয়েছে ৩৪৩টি ফ্ল্যাট ও প্রতিষ্ঠান। দুবাই বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে ২২৮টি ফ্ল্যাট ও দুটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি এবং সিঙ্গাপুরেও ফ্ল্যাট ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে তার নামে। সব মিলিয়ে বিদেশে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায়। দেশের ব্যাংকিং খাত থেকেও তিনি বাছবিচারহীনভাবে অর্থ সরিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট এবং বিভিন্ন সময়ে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও তার ঘাড়ে।

২০১৩ সালে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে উপনির্বাচনে জিতে রাজনীতির মাঠে আসা সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে হন পূর্ণ মন্ত্রী। মন্ত্রিত্বের এই সময়কালটাকেই তিনি নিজের আখের গোছানোর স্বর্ণযুগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। সরকারি আদেশের (জিও) নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি সরকারি কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত কাজেই বিদেশ ভ্রমণে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কখনও চিকিৎসার নাম করে, কখনও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিছক ভ্রমণের ছলে তিনি দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু প্রতিটি সফরের শেষেই তার বিদেশি সম্পদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পালক।

বর্তমানে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুখমীলা জামানের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত। জব্দ করা হয়েছে তাদের দেশ-বিদেশের ৫৮০টি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমি। একসময় যিনি দোর্দণ্ড প্রতাপে মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন, আজ তার বিরুদ্ধেই আড়াই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির ফাইল দুদকের টেবিলে। দেশের মানুষের করের টাকায় বেতনভুক্ত হয়ে, জনগণের আমানত খেয়ানত করে বিদেশে যিনি বিত্তের পাহাড় গড়েছেন, সেই সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ‘ফ্রিকুয়েন্ট ফ্লায়ার’ জীবনের জবনিকা এখন আদালতের কাঠগড়ায়। ক্ষমতার অপব্যবহার আর ওমরাহ’র পবিত্রতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দুর্নীতির যে ইমারত তিনি গড়েছিলেন, তা এখন ধসে পড়ার অপেক্ষায়।

পাঠকপ্রিয়