সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

শীত আর ভোটের উত্তাপে চায়ের বাজার এখন গরম

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে দেশের চায়ের বাজারে এখন সুবাতাস বইছে। সাধারণত বছরের এই সময়ে নিলামে চায়ের মান ও দাম নিম্নমুখী থাকলেও এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে শীতের তীব্রতা, অন্যদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই দুইয়ের প্রভাবে চায়ের চাহিদা ও দামে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোল এবং শীতকালীন চাহিদার কারণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম চা সংগ্রহে তোড়জোড় শুরু করায় নিলামে বিক্রির হার রেকর্ড ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যতায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা টানছিল চা বাগানগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চলতি বছরের মাঝামাঝিতে নিলামের ন্যূনতম মূল্যস্তর সংশোধন করে। এতে চায়ের গড় দাম কিছুটা বাড়লেও বিক্রিতে গতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হতেই নিলামে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ তিনটি নিলামে চায়ের দাম ও বিক্রির হার ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চায়ের উৎপাদনের ভরা মৌসুম এবং এ সময় ভালো মানের চা নিলামে আসে। নভেম্বর থেকে চায়ের গুণগত মান কমতে থাকায় দামও পড়ে যায়। কিন্তু এবার মৌসুমের শেষ প্রান্তেও চায়ের বাজার চাঙ্গা। বাংলাদেশ চা বোর্ড ও ন্যাশনাল ব্রোকার্সের তথ্যমতে, গত ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৩১তম নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে ২৬৫ টাকা ৬ পয়সায় বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ টাকা বেশি। এর আগের ৩০তম নিলামে এই ব্যবধান ছিল ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা। এভাবে বিগত চারটি নিলামেই গত বছরের চেয়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা বেশি দরে চা বিক্রি হয়েছে।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান এ বিষয়ে জানান, এ বছর চায়ের উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় দাম বাড়তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আসন্ন নির্বাচনের প্রভাব। বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় চায়ের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাঁর মতে, বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে বাগান মালিকরা উন্নত মানের চা উৎপাদনে আরও বেশি উৎসাহী হবেন।

বাগান মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে আছে। ১৭২টি বাগানে ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার কেজি। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। খরচের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে অনেক বাগান যখন ধুঁকছিল, তখন নির্বাচনী এই উত্তাপ তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

দ্য কনসুলেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির (ফিনলে) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) তাহসিন আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, বিগত দেড় দশকের মধ্যে এবারই মানুষ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে বাগান মালিক থেকে শুরু করে প্যাকেটজাতকারী কোম্পানিগুলো এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আগামী কয়েক মাসে বাগান থেকে খুব ভালো মানের চা আসবে না, তাই আসন্ন নির্বাচন ও শীত মৌসুমকে সামনে রেখে শীর্ষ ক্রেতারা এখনই তাদের মজুদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন।

বাজারের এই উলম্ফনে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো। ইস্পাহানি, আবুল খায়ের, ইউনিলিভার, মেঘনা ও পারটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিলাম থেকে বিপুল পরিমাণ চা কিনছে। ৩১তম নিলামের প্রতিবেদন বলছে, সর্বোচ্চ দরে বিক্রি হওয়া ১০টি লটের মধ্যে সাতটিই কিনেছে আবুল খায়ের টি কোম্পানি। এমনকি ৩রা ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নিলামে প্রতি কেজি ৩৫৯ টাকা দরেও চা কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম অবশ্য এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। তিনি জানান, নির্বাচনকে ঘিরে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক এবং চায়ের চাহিদাও বাড়ে। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী ডামাডোল যত স্পষ্ট হবে, চা-কেন্দ্রিক অর্থনীতি ততটাই চাঙ্গা হবে বলে তিনি মত দেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন ও শীতের কারণে সীমান্তে চোরাচালান কমে যাওয়া এবং দেশীয় উৎপাদন হ্রাসের কারণেও দামে প্রভাব পড়েছে। তবে মৌসুমের শেষ সময়ে এসেও চায়ের এমন তেজি ভাব এবং ৯০ শতাংশ চা বিক্রি হয়ে যাওয়াকে তারা নির্বাচনী অর্থনীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবেই দেখছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

শীত আর ভোটের উত্তাপে চায়ের বাজার এখন গরম

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:১৪

দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে দেশের চায়ের বাজারে এখন সুবাতাস বইছে। সাধারণত বছরের এই সময়ে নিলামে চায়ের মান ও দাম নিম্নমুখী থাকলেও এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে শীতের তীব্রতা, অন্যদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই দুইয়ের প্রভাবে চায়ের চাহিদা ও দামে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোল এবং শীতকালীন চাহিদার কারণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম চা সংগ্রহে তোড়জোড় শুরু করায় নিলামে বিক্রির হার রেকর্ড ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যতায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা টানছিল চা বাগানগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চলতি বছরের মাঝামাঝিতে নিলামের ন্যূনতম মূল্যস্তর সংশোধন করে। এতে চায়ের গড় দাম কিছুটা বাড়লেও বিক্রিতে গতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হতেই নিলামে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ তিনটি নিলামে চায়ের দাম ও বিক্রির হার ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চায়ের উৎপাদনের ভরা মৌসুম এবং এ সময় ভালো মানের চা নিলামে আসে। নভেম্বর থেকে চায়ের গুণগত মান কমতে থাকায় দামও পড়ে যায়। কিন্তু এবার মৌসুমের শেষ প্রান্তেও চায়ের বাজার চাঙ্গা। বাংলাদেশ চা বোর্ড ও ন্যাশনাল ব্রোকার্সের তথ্যমতে, গত ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৩১তম নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে ২৬৫ টাকা ৬ পয়সায় বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ টাকা বেশি। এর আগের ৩০তম নিলামে এই ব্যবধান ছিল ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা। এভাবে বিগত চারটি নিলামেই গত বছরের চেয়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা বেশি দরে চা বিক্রি হয়েছে।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান এ বিষয়ে জানান, এ বছর চায়ের উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় দাম বাড়তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আসন্ন নির্বাচনের প্রভাব। বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় চায়ের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাঁর মতে, বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে বাগান মালিকরা উন্নত মানের চা উৎপাদনে আরও বেশি উৎসাহী হবেন।

বাগান মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে আছে। ১৭২টি বাগানে ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার কেজি। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। খরচের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে অনেক বাগান যখন ধুঁকছিল, তখন নির্বাচনী এই উত্তাপ তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

দ্য কনসুলেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির (ফিনলে) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) তাহসিন আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, বিগত দেড় দশকের মধ্যে এবারই মানুষ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে বাগান মালিক থেকে শুরু করে প্যাকেটজাতকারী কোম্পানিগুলো এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আগামী কয়েক মাসে বাগান থেকে খুব ভালো মানের চা আসবে না, তাই আসন্ন নির্বাচন ও শীত মৌসুমকে সামনে রেখে শীর্ষ ক্রেতারা এখনই তাদের মজুদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন।

বাজারের এই উলম্ফনে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো। ইস্পাহানি, আবুল খায়ের, ইউনিলিভার, মেঘনা ও পারটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিলাম থেকে বিপুল পরিমাণ চা কিনছে। ৩১তম নিলামের প্রতিবেদন বলছে, সর্বোচ্চ দরে বিক্রি হওয়া ১০টি লটের মধ্যে সাতটিই কিনেছে আবুল খায়ের টি কোম্পানি। এমনকি ৩রা ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নিলামে প্রতি কেজি ৩৫৯ টাকা দরেও চা কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম অবশ্য এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। তিনি জানান, নির্বাচনকে ঘিরে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক এবং চায়ের চাহিদাও বাড়ে। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী ডামাডোল যত স্পষ্ট হবে, চা-কেন্দ্রিক অর্থনীতি ততটাই চাঙ্গা হবে বলে তিনি মত দেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন ও শীতের কারণে সীমান্তে চোরাচালান কমে যাওয়া এবং দেশীয় উৎপাদন হ্রাসের কারণেও দামে প্রভাব পড়েছে। তবে মৌসুমের শেষ সময়ে এসেও চায়ের এমন তেজি ভাব এবং ৯০ শতাংশ চা বিক্রি হয়ে যাওয়াকে তারা নির্বাচনী অর্থনীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবেই দেখছেন।