মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য কবে খুলবে, তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং মানবপাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলার জেরে বাংলাদেশের জন্য এই বাজারের দুয়ার যখন সংকুচিত, তখন সেই সুযোগ পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়া সরকারের দেওয়া কঠিন সব শর্ত এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা বোয়েসেলের ধীরগতির কারণে আটকেপড়া ১৮ হাজার শ্রমিকের ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের পাঠানোর সময়সীমা থাকলেও এখন পর্যন্ত পাঠানো গেছে মাত্র ১৯০ জনকে।
বায়রা সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেলেও গত এক বছরে বাংলাদেশ পাঠাতে পেরেছে নামমাত্র কর্মী। ২০২৪ সালে নেপাল থেকে ২১ হাজার ১৮৩ জন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ২৯ হাজার ৯০০ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন।
গত নভেম্বরেই নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ৮ হাজার ৩৩৪ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গেলেও বাংলাদেশ থেকে গেছেন মাত্র ৯০ জন। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, আগামী জানুয়ারিতে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের নিবন্ধনেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। যেখানে নেপালের ৬০ হাজার এবং ইন্দোনেশিয়ার ২২ হাজারের বেশি কর্মী নিবন্ধন করেছেন, সেখানে বাংলাদেশের নিবন্ধন মাত্র ১ হাজার ৮৫৩ জনের।
মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য নতুন করে কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, যেসব এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, তাদের অফিসের আয়তন হতে হবে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুট। এক ফুট কম হলেও তাদের নাম তালিকায় রাখা হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ এজেন্সির পক্ষে এই শর্ত পূরণ করা অসম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও এই অদ্ভুত শর্তের আড়ালে নতুন করে ‘সিন্ডিকেট’ ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
গত বছরের ৩১ মে পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মী। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পর তাদের পাঠানোর দায়িত্ব পায় সরকারি সংস্থা বোয়েসেল। কিন্তু গত জুলাইয়ের পর থেকে তারা মাত্র ১৫০ জনকে পাঠাতে পেরেছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাকিদের পাঠানো না গেলে তাদের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যাবে।
অভিযোগ উঠেছে, আটকেপড়া শ্রমিকদের ‘বিনা খরচে’ পাঠানোর কথা থাকলেও বোয়েসেল জনপ্রতি ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করছে। এছাড়া ভিসা কেনার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে সরকারি এই সংস্থাটির বিরুদ্ধে।
বায়রার জ্যেষ্ঠ সদস্য মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, “বেসরকারি এজেন্সিগুলো ভিসা ট্রেডিং করলে সিআইডি ও দুদক মামলা করে। এখন সরকারি সংস্থাও (বোয়েসেল) হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? বোয়েসেল বেঁধে দেওয়া সময়ে মাত্র ১৯০ জনকে পাঠাতে পেরেছে।”
মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের মতে, বাংলাদেশে বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের ‘ঢালাও’ মামলার কারণে অভিবাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকার এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়েছে।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, “কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। এগুলো অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করা জরুরি। মামলা থাকলে কোনো এজেন্সি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করে।”
ইউনিভার্সিটি অব পুত্রামালয়েশিয়ার গবেষক সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে শ্রমবাজার খুলতে পারেনি। এই সুযোগটি নিচ্ছে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া। আমরা কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখছি না।”