দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছেন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করা প্রত্যেক নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান এবং সেই হিসাবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত প্রায় ৫২ লাখ শিক্ষার্থী এবার ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। বিগত চারটি সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা স্তরে অধ্যয়নরত ভোটার এবারই সবচেয়ে বেশি, যা ২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় চার গুণ।
চলতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, বর্তমানে উচ্চশিক্ষা স্তরে বিদেশি শিক্ষার্থী বাদে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ১২০ জন। এর মধ্যে ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩ জন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ৪৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৬৯ জন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৫৮৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানেও আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর কাছাকাছিই রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও ছাত্রনেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আজিজুল হক জানান, আসন্ন নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবেন এবং তাদের বেশিরভাগই প্রার্থীর যোগ্যতা ও কর্মকাণ্ড দেখে ভোট দেবেন, ঠিক যেমনটি ডাকসু নির্বাচনে দেখা গেছে। ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান মনে করেন, তরুণদের অধিকাংশ ভোট যেদিকে যাবে, জনগণের রায়ও সেদিকেই প্রতিফলিত হবে, কারণ শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবার ও আশপাশের মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
শিক্ষার্থীদের ভোটের সিদ্ধান্তে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেট অর্গানাইজেশনের (জেইউডিও) সাধারণ সম্পাদক ফারিম আহসান জানান, শিক্ষা শেষে কাজের সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও আধুনিক অর্থনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণের পথ দেখাতে পারা রাজনৈতিক শক্তিই তরুণদের সমর্থন পাবে। এছাড়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী খান মুহাম্মদ মামুন মনে করেন, এবারের ভোটে কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নয়, গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারেরও সুযোগ থাকায় তরুণরা এ নির্বাচন নিয়ে বেশি আগ্রহী।
রাজনৈতিক দলগুলোও শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর অঙ্গীকার করেছে। দলটির এবারের স্লোগান, ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের জন্য হোক’। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, তারা দেশ গড়ার যে পরিকল্পনা তুলে ধরছেন, সেখানে তরুণদের আকাঙ্ক্ষাগুলো রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং নৈতিক-কারিগরি ও উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জয়ী হলে প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে তাদের সরকার এবং যেখানে যার আগ্রহ থাকবে, সেখানেই মেধা ও দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তরুণদের জন্য আধুনিক কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিষয়ভিত্তিক চাকরির ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন উল্লেখ করেন, এনসিপি জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত এবং তরুণরা বিপ্লবীদেরই পছন্দ করবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন মনে করেন, বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা ‘জেন-জি’ প্রজন্ম অনেক বুদ্ধিমান এবং তারা বুঝেশুনে চিন্তাভাবনা করেই ভোট দেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক মার্কা বা দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জীবনমান উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েই এবার তরুণরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।