ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচারণার মাঠে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে নারায়ণগঞ্জের একজন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পরদিন ঢাকার পুরান পল্টনে প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনার পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি জানান, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাসুদুজ্জামান মাসুদ উল্লেখ করেন, তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত এবং এই বিষয়ে কোনো আপস করতে পারছেন না। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না—এমন অভিযোগ না করলেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে তিনি জানান।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, হাদির ওপর হামলার পর তাতে ভাটা পড়েছে। অনেক প্রার্থীই এখন অনানুষ্ঠানিক গণসংযোগে নামতে ভয় পাচ্ছেন। কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী আমির হামজা জানিয়েছেন, হামলার ঘটনার পর তাঁরা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা হলেও প্রচার-প্রচারণা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে এবং একান্ত প্রয়োজনে বের হলে অন্তত ১৫ জন কর্মী সঙ্গে নিয়ে বের হচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধারা’ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেছেন, তিনি ও তাঁর নেতা-কর্মীরা নিয়মিত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি সাধারণ ভোটারদেরও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের চালিতাতলীতে বিএনপির প্রার্থী এরশাদউল্লাহর গণসংযোগে গুলির ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহত হন। ওই ঘটনা এবং সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, ঝুঁকি বিবেচনায় প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে পুলিশের কাছে আসলে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে ‘অতিঝুঁকি’, ‘মাঝারি ঝুঁকি’ এবং ‘কম ঝুঁকি’—এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিরাপত্তা প্রটোকল সাজানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইতিমধ্যে জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, যেসব প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি, তাঁরা সার্বিক সময়ের জন্য গানম্যান পাবেন। প্রয়োজনে বাসা ও অফিসে স্থায়ীভাবে পুলিশ মোতায়েন করা হবে এবং গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রার্থীরা নিজস্ব সশস্ত্র দেহরক্ষীও রাখতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং তাঁদের জন্য সশস্ত্র ব্যক্তি নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা একটি সমন্বিত নিরাপত্তা প্রটোকল তৈরি করছে।
তবে প্রশাসনের এসব আশ্বাসের পরেও মাঠ পর্যায়ে শঙ্কা কাটছে না। ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল মনে করেন, একটি অদৃশ্য ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। তাঁর মতে, স্বাধীনতাবিরোধী একটি পক্ষ এখনো সক্রিয় এবং তারা প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতা পাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফয়জুল হকও জানিয়েছেন, তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তি বোধ করছেন না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান পরিস্থিতিকে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেই উদ্যোগী হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে, অন্যথায় প্রার্থী ও ভোটারদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।