সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

জোট নয়, শরিকদের জন্য ‘আসন ছাড়’ বিএনপির

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনের যে ধারণা এত দিন রাজনৈতিক মহলে ছিল, তাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

দলটির নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, শরিকদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী জোট হচ্ছে না। তবে সমঝোতার ভিত্তিতে শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেবে না বা ইতিমধ্যে ঘোষণা করা প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেবে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, কিছু আসনে সমঝোতা হলেও বেশ কিছু আসন ‘উন্মুক্ত’ রাখা হতে পারে, যেখানে শরিক দলগুলো চাইলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) দলীয় নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে বিএনপিতে তীব্র প্রার্থীজট তৈরি হয়েছে।

এছাড়া ফ্যাসিবাদী শাসনের গত ১৫ বছরে নির্যাতনের শিকার নেতাদের একটি বড় অংশের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা উপেক্ষা করা নেতৃত্বের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জোটগত নির্বাচনের পরিবর্তে ‘আসন ছাড়ের’ কৌশলে হাঁটছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা যা করছেন সেটি কোনো জোট নয়। বরং বিগত যুগপৎ আন্দোলনের যে ধারণা ছিল, সেই আলোকেই শরিকদের কিছু আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। বিএনপি ইতিমধ্যে দুই দফায় ২৭২টি আসনে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই এসব প্রার্থী ঘোষণা করায় শরিকদের মধ্যে মনোক্ষুণ্নতা তৈরি হয়েছে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে এখনো আলোচনা চলছে এবং কোন কোন আসনে ছাড় দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে শরিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ-৫, নড়াইল-২, কুষ্টিয়া-২ এবং ঢাকা-১২ সহ বেশ কিছু আসনে শরিক দলের নেতারা নির্বাচন করতে আগ্রহী হলেও বিএনপি সেখানে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জোট করে দলের পরিধি সংকুচিত হলে তাঁরা নিজেদের মতো করেই নির্বাচন করবেন। ২০১৮ সালে শরিকদের যেসব আসন দেওয়া হয়েছিল, এবার তার চেয়ে কম আসন দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ায় শরিকদের মধ্যে এই অসন্তোষ বেড়েছে।

আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার শরিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানিয়েছেন, দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্য ধরে রাখা এবং আসন সমঝোতা নিয়ে সৃষ্ট দূরত্ব মেটানোর জন্য ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে একমাত্র লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যিনি সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চারটি আসন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি, যদিও দলটি আরও ছয়টি আসন দাবি করছে। জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী জানিয়েছেন, তাঁরা ১৮ ডিসেম্বরের আলোচনার অপেক্ষায় আছেন।

শরিকদের আসন ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি লন্ডন থেকে সিদ্ধান্ত দেবেন নাকি আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত জানাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আগামী ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে বলে সময়ের সীমাবদ্ধতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, শরিকদের সঙ্গে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের আসনে বিএনপি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে এবং প্রয়োজনে ঘোষিত প্রার্থী সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছে দলটি।

পাঠকপ্রিয়