চট্টগ্রাম মহানগরে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করে সন্ত্রাসীদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্রমশ বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি ও দখলদারিত্ব চালাচ্ছে তারা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৮১৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)-এর তথ্যমতে, এর মধ্যে ১৫৪টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই তালিকায় রয়েছে চাইনিজ রাইফেল, শটগান ও এসএমজির মতো ভারী আগ্নেয়াস্ত্র।
সিএমপির উপকমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন্স) মো. রইছ উদ্দিন জানান, চলতি বছরের গত ১১ মাসে মহানগরের ১৬টি থানা থেকে ৫৬টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও লুণ্ঠিত ১৫৪টি অস্ত্র এখনো অপরাধীদের হাতে। এসব অস্ত্র ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, “আমরা লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছি। নির্বাচনের আগে এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে।”
সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও মহড়া
নগরের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, বায়েজিদ ও হাটহাজারী এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণ বা জমি কেনাবেচা করলেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর নামে ফোন আসছে। বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের অনুসারীরা চাঁদা দাবি করছে। টাকা না দিলে সশস্ত্র মহড়া দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি পাঁচলাইশের হামজারবাগ এলাকায় মিজান, জসিম, আমির হোসেন ও জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি নির্মাণ কাজ চাঁদার দাবিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার বায়েজিদ থানার কুলগাঁও এলাকায় যুবদল নেতার বাড়িতে হামলার পর স্থানীয়রা একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, দুই যুবক প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে ঢুকে গুলি করার হুমকি দিচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সাজ্জাদ আলীর হয়ে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে কারাগারে থাকা আরেক সন্ত্রাসী ‘ছোট সাজ্জাদ’-এর সহযোগী রায়হান ও ইমন।
অস্ত্র কেনাবেচার ফোনালাপ ফাঁস
সম্প্রতি নগরীর বাকলিয়া এলাকায় জাকির হোসেন ওরফে ‘আাতুরি জাকির’ এবং আবদুস সোবহান নামের দুই ব্যক্তির মধ্যে অস্ত্র কেনাবেচার একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেড় লাখ টাকায় বিদেশি পিস্তল এবং ৫০ হাজার টাকায় ভারতীয় কারিগরের তৈরি অস্ত্র বিক্রির দরদাম করতে শোনা যায়। এমনকি হত্যাকাণ্ডের জন্য ‘মোটা দানা’র বিশেষ গুলি ব্যবহারের পরামর্শ এবং প্রয়োজনে ‘প্রফেশনাল শুটার’ পাঠানোর কথাও বলা হয় ওই ফোনালাপে।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানান, ভাইরাল হওয়া অডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে এবং পুলিশ কমিশনার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা ও উদ্ধার অভিযান
গত ১৪ মাসে রাউজান উপজেলায় ১৭টি হত্যাকাণ্ড এবং গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ওই ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহত হলেও মূল অভিযুক্ত সাজ্জাদ হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশের তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম মহানগরে ৭৯৩টি এবং জেলায় ৫৭৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাব উদ্ধার করেছে আরও ২০০টি অস্ত্র। সব মিলিয়ে গত এক বছরে প্রায় দেড় হাজার দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে।
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “লুণ্ঠিত অস্ত্রের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়েও কিছু অস্ত্র ঢুকছে। তবে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এই অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। খুব শিগগিরই অস্ত্রবাজি বন্ধ করতে পারব বলে আশা করছি।”