সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

উচ্চশিক্ষায় মালয়েশিয়ামুখী বাংলাদেশিরা, এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৭ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়া। রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, তুলনামূলক কম খরচ এবং আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির ফলে দেশটির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ।

এডুকেশন মালয়েশিয়া গ্লোবাল সার্ভিসেসের (ইএমজিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন ৬ হাজার ১০৩ জন। আর চলতি বছরের (২০২৫) নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯৫৭ জনে।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে চীন। চলতি বছর চীন থেকে ২৯ হাজার ৩৮৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় অবস্থানে ভারত।

কেন মালয়েশিয়াকে বেছে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে ভিসা প্রাপ্তির জটিলতা এবং উচ্চব্যয়ের বিপরীতে মালয়েশিয়ায় মানসম্মত শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সহজ ভর্তি প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় (আইআইইউএম) স্নাতকোত্তর কোর্সে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার মান এবং গবেষণার সুযোগ-সুবিধায় অনেক এগিয়ে আছে। সে তুলনায় এখানে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কম। সেলফ ফান্ডিংয়ে এলেও ভর্তির পর বিভিন্ন বৃত্তি ও ফান্ডিং লাভের সুযোগ আছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখানে ভর্তি প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ। বেশির ভাগ দেশে আইইএলটিএস বাধ্যতামূলক হলেও মালয়েশিয়ায় তা নয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মাকেও আনার সুযোগ পান। মালয়েশিয়ার ডিগ্রিধারীরা পরবর্তী সময়ে ইউরোপ-আমেরিকার নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজে ভর্তির সুযোগ পান বলেও জানান সুমাইয়া।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল এবং ভৌগোলিক দূরত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুমাইয়া বলেন, ভিসা জটিলতা না থাকায় অভিভাবকরা সহজেই যাতায়াত করতে পারেন, যা শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।

শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিক্ষার মানের ঘাটতির কারণে সামর্থ্যবান অভিভাবকরা মালয়েশিয়াকে নিরাপদ গন্তব্য মনে করছেন। তিনি বলেন, সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং গবেষণায় অনেক এগিয়ে। অভিভাবকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয় না।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ওভারসিজ হাইওয়ের ম্যানেজিং পার্টনার ও পিএইচডি গবেষক মো. জারিস ইসলাম বলেন, শুধু উচ্চশিক্ষাই নয়, মালয়েশিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে। বাংলাদেশের নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খরচের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ব্যয়ের খুব একটা পার্থক্য নেই, কিন্তু মানের দিক থেকে তারা এগিয়ে। এছাড়া সেখানকার ডিগ্রিধারীদের বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ মানসম্মত শিক্ষা ও উন্নত জীবনমানের প্রত্যাশা। আগে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঝোঁক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দিকে থাকলেও সম্প্রতি ভিসা জটিলতার কারণে অনেকে বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিচ্ছেন।

র‍্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়ার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুদৃঢ় হচ্ছে। ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংস ২০২৬’ অনুযায়ী, আসিয়ান অঞ্চলের শীর্ষ ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সাতটিই মালয়েশিয়ার। বর্তমানে দেশটির ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি পেট্রোনাস (ইউটিপি) ও ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম) বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে ২০১-২৫০ ব্যান্ডে অবস্থান করছে।

বিদেশে শিক্ষার ব্যয় বাড়ছে শিক্ষার্থী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশিরা বিদেশে শিক্ষার ব্যয়ে ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

পাঠকপ্রিয়