দেশে প্রথমবারের মতো ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এই ব্যাংক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে এবং মূলত নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিদ্যমান ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি পরিচালিত হবে, যেখানে ব্যাংকের মালিকানার বড় অংশই থাকবে ঋণগ্রহীতাদের হাতে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। খসড়া অনুযায়ী, এই ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না। অর্থাৎ, এসব ব্যাংকের শেয়ার পুঁজিবাজারে কেনাবেচার যোগ্য হবে না। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণদানকারী এনজিওগুলো কেবল তাদের সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় বা আমানত নিতে পারে, কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ করতে পারবে।
সূত্র জানায়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ১৭ মে ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নতুন ভবন উদ্বোধনের সময় এই ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেছিলেন, ক্ষুদ্রঋণই ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ এবং এই ব্যাংক চলবে বিশ্বাস ও আস্থার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে ঋণ নিতে জামানত লাগবে না। প্রধান উপদেষ্টার ওই বক্তব্যের পরই তাঁর কার্যালয় থেকে খসড়াটি তৈরি করে দেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৩০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন হবে ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ জোগান দেবেন ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা বা শেয়ারমালিকরা। বাকি ৪০ শতাংশ অর্থ দেবেন উদ্যোক্তারা। প্রচলিত ব্যাংকের মতো উদ্যোক্তারা পুরো লভ্যাংশ নিতে পারবেন না; তাঁরা কেবল তাঁদের বিনিয়োগ করা ৪০ শতাংশের লভ্যাংশই নিতে পারবেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হবে সাত সদস্যের, যার মধ্যে তিনজন পরিচালক থাকবেন ঋণগ্রহীতাদের মধ্য থেকে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, আইনের একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি হয়েছে। এর ওপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে বৈঠক করে চূড়ান্ত খসড়া তৈরির কাজ করা হবে।
খসড়া আইন অনুযায়ী, এমআরএর আওতায় একটি আলাদা বিভাগ বা দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে এই ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হবে। তবে ‘ব্যাংক’ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান নামের শেষে ‘ব্যাংক’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হতেই পারে। তবে ‘ব্যাংক’ শব্দটি ব্যবহার করতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। চূড়ান্ত খসড়া তৈরির আগে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রবৃদ্ধির স্বার্থে এবং এ খাতকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজনে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হতেই পারে। তবে দেখতে হবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কী চায় এবং ঋণগ্রহীতাদের জন্য তা ভালো হবে কি না। বিধান করতে গিয়ে তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, এ খাতের পরিসর বড় করতে ক্ষুদ্র অর্থায়ন ব্যাংকের প্রয়োজন আছে। তবে আইনকানুন অনুসরণ করে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী এনে এটি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে লাভ কী হবে, তার সমীক্ষা করা দরকার।
উল্লেখ্য, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক বা ‘স্মল ফিন্যান্স ব্যাংক’ চালু রয়েছে। ২০১৪ সালে এনজিও হিসেবে কাজ করা বন্ধন প্রতিষ্ঠানকে ‘বন্ধন ব্যাংক’ হিসেবে লাইসেন্স দেয় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৮৩টি ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংখ্যা ৩ কোটি ২৩ লাখ।