রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) মোট সম্পদের পরিমাণ ৬৭ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও এর মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদের কোনো লিখিত নথিপত্র নেই। ব্রিটিশ আমলের টেলিগ্রাফ ব্রাঞ্চের উত্তরসূরি এই প্রতিষ্ঠানটি টানা ১৪ বছর লোকসান গোনার পর এখন ব্যাংকের সুদ আয়ে নিট মুনাফায় ফিরলেও পরিচালন কার্যক্রমে এখনো লোকসানেই রয়েছে। সম্পদের হিসাব না থাকা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক।
বিটিসিএলের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোম্পানিটির মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৫৭ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদের কোনো লিখিত বিবরণ নেই। ফলে এসব সম্পদ বাস্তবে আছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে নিয়োগকৃত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আনিস সালাম ইদ্রিস অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।
কেবল স্থায়ী সম্পদই নয়, বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা বিটিসিএলের ৫৩২ কোটি টাকার নগদ অর্থের যথার্থতা ও অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা। ব্যাংক বুক লেজার বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট সরবরাহ করতে না পারায় এই তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মন্দ ঋণের বিপরীতে ২ হাজার ১৬৩ কোটি টাকার সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হলেও স্থানীয় ও বিদেশি গ্রাহকদের কাছে পাওনার বিস্তারিত নথিপত্র বা তালিকা নিরীক্ষককে দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, বিটিসিএলের জমি, টাওয়ার ও সরঞ্জামের মতো অনেক সম্পদ থাকলেও সেগুলোর কোনো রেজিস্টার পাওয়া যায়নি। কবে এসব কেনা হয়েছে বা বর্তমানে কী অবস্থায় আছে, তার কোনো রেকর্ড না থাকায় অবচয় ধার্য করা যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তনের উদ্যোগও এখানে দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২০০৮ সালে কোম্পানি হিসেবে যাত্রার পর টানা ১৪ বছর লোকসান দিয়েছে বিটিসিএল। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে নিট মুনাফায় ফিরলেও মূলত ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের সুদের ওপর ভর করেই এটি সম্ভব হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ৮৯৯ কোটি টাকা, তবে পরিচালন লোকসান হয়েছে ৩২ কোটি টাকা। ব্যাংকে থাকা ১ হাজার ৯২২ কোটি টাকার আমানত থেকে ২৪৬ কোটি টাকা সুদ আসায় কর-পরবর্তী ৭৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে।
আর্থিক অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে বিটিসিএলের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে ৩২৬ কোটি টাকার ‘ফাইভজি রেডিনেস’ প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। তদন্তে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক এক সচিবের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন’ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদনে বিটিসিএলকে ঋণ পরিশোধ ও প্রচ্ছন্ন দায়ের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ জানান, পাওনা অর্থের বিষয়ে নথিপত্র রয়েছে এবং গরমিল নিরসনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মাধ্যমে একটি কমিটি কাজ করছে। তিনি বলেন, বিগত বছরের তুলনায় পরিচালন লোকসান কমেছে এবং আগামীতে ব্রেক-ইভেনে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সম্পদের হিসাব সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ইআরপি সফটওয়্যার ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ও বিটিসিএলের চেয়ারম্যান আব্দুন নাসের খান জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে সরকার সংস্কার কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকদের সহায়তায় বিটিসিএলের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার ও অরক্ষিত সম্পদ সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।