সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কোন দেশে কতটি বাঘ টিকে আছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকৃতি যখন তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চায়, তখন সে সৃষ্টি করে বাঘের মতো এক রাজকীয় প্রাণীকে। বাঘ কেবল একটি বন্যপ্রাণী নয় বরং এটি একটি সুস্থ বনের প্রতীক, একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যেখানে বিশ্বে প্রায় ১ লাখ বাঘের অবাধ বিচরণ ছিল, বিংশ শতাব্দীর শেষে তা কমে মাত্র কয়েক হাজারে এসে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫ সালে এসে আমরা এক নতুন ভোরের দেখা পাচ্ছি। বাঘ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক যে প্রচেষ্টা গত এক দশকে নেওয়া হয়েছিল, তার সুফল এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। ভারত থেকে শুরু করে রাশিয়া কিংবা বাংলাদেশের সুন্দরবন—প্রতিটি জনপদেই বাঘের গল্পের প্রেক্ষাপট আলাদা। এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে কোন দেশ বাঘ সংরক্ষণে কতটা এগিয়ে এবং কোন চ্যালেঞ্জগুলো এখনো আমাদের সামনে রয়ে গেছে।

১. ভারত: বিশ্বের বাঘ সংরক্ষণের সফলতম মডেল

ভারতের বাঘ সংরক্ষণের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় এবং দীর্ঘ। ২০২৫ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ৩ হাজার ১৬৭টি। ভারতের এই অসামান্য সাফল্যের পেছনে রয়েছে ১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া ‘প্রজেক্ট টাইগার’। এটি সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প। ভারতের ২০টি রাজ্যের প্রায় ৫৮টি টাইগার রিজার্ভে এই বাঘগুলো বসবাস করছে। ভারতের বাঘ সংরক্ষণের মূল শক্তি হলো তাদের কঠোর আইন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

ভারতের উত্তরাখন্ডের করবেট টাইগার রিজার্ভ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাঘের আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত যেখানে প্রায় ২৬০টি বাঘ বাস করে। এছাড়াও রাজাজি টাইগার রিজার্ভে বাঘের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা হিমালয়ের পাদদেশের বনাঞ্চলকে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দান করেছে। ভারতের মধ্যাঞ্চলের মধ্যপ্রদেশকে বলা হয় ‘টাইগার স্টেট’। কানহা, বান্ধবগড় এবং পেঞ্চ জাতীয় উদ্যানগুলো বাঘের প্রজননের জন্য এক স্বর্গতুল্য পরিবেশ তৈরি করেছে। মানস জাতীয় উদ্যান এক সময় চরম সংকটের মধ্য দিয়ে গেলেও বর্তমানে সেখানে বাঘের সংখ্যা অনেক বেড়েছে যা সত্যিই বিস্ময়কর। ভারত কেবল বাঘের সংখ্যা বাড়ায়নি বরং তারা বাঘের শিকার প্রাণী যেমন হরিণ এবং বন্য শুকরের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপরও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। ভারতের এই মডেলে স্থানীয় গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে মানুষ এবং বাঘের মধ্যকার সংঘাত কমিয়ে আনা যায়।

২. রাশিয়া: সাইবেরীয় বাঘের তুষারাবৃত সাম্রাজ্য

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাঘের দেশ হলো রাশিয়া। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের দুর্গম এবং অত্যন্ত শীতল বনাঞ্চল হলো সাইবেরীয় বাঘ বা আমুর টাইগারের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৭৫০টি বাঘ রয়েছে। রাশিয়ার এই বাঘগুলো আকারে বিশ্বের অন্যান্য বাঘের চেয়ে বড় এবং এদের গায়ের লোম অনেক বেশি ঘন যা তাদের হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। রাশিয়ার বাঘ সংরক্ষণের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তাদের রাষ্ট্রীয় কঠোর নীতি।

রাশিয়ায় বাঘের বিচরণক্ষেত্র অত্যন্ত বিশাল। একটি পুরুষ সাইবেরীয় বাঘের জন্য কয়েকশ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রয়োজন হয়। রাশিয়ার বনাঞ্চলে বাঘের প্রধান খাদ্য হলো বন্য বরাহ এবং হরিণ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে বাঘ সংরক্ষণে উৎসাহ প্রদান করায় সেখানে বাঘের সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক জোরদার হয়েছে। রাশিয়ার বাঘেরা মূলত জনহীন অঞ্চলে বাস করে বিধায় সেখানে মানুষের সাথে বাঘের লড়াইয়ের ঘটনা খুবই বিরল। তবে চোরাকারবারিরা এখনো রাশিয়ার বাঘের জন্য বড় হুমকি কারণ রাশিয়ার বাঘের হাড় এবং চামড়া আন্তর্জাতিক কালোবাজারে অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। রাশিয়ার বন রক্ষীরা আধুনিক ড্রোন এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন যা তাদের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।

৩. ইন্দোনেশিয়া: সুমাত্রা বাঘের অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত সংগ্রাম

ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৪০০টি বাঘ রয়েছে যা দেশটিকে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রেখেছে। তবে এই সংখ্যাটি আনন্দের চেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ ইন্দোনেশিয়ায় কেবল সুমাত্রা প্রজাতির বাঘই টিকে আছে যা বর্তমানে ‘চরম বিপন্ন’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। ইন্দোনেশিয়ার ঘন রেইনফরেস্ট এক সময় বাঘের গর্জনে মুখরিত থাকত কিন্তু গত কয়েক দশকে পাম তেল উৎপাদনের জন্য ব্যাপকহারে বন উজাড় করা হয়েছে। এর ফলে বাঘের আবাসস্থল ছোট হয়ে এসেছে এবং তারা লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

সুমাত্রা বাঘেরা মূলত গুনুং লিউসার, কেরিঞ্চি–সেবলাত এবং বুকিত বারিসান সেলাতান জাতীয় উদ্যানে বসবাস করে। এই বাঘগুলো আকারে বেঙ্গল টাইগারের চেয়ে কিছুটা ছোট এবং এদের গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলো অনেক বেশি ঘন। ইন্দোনেশিয়া সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে মিলে বাঘের এই প্রজাতিকে রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা বনের ভেতর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকাগুলোকে করিডোরের মাধ্যমে যুক্ত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে যাতে বাঘেরা অবাধে যাতায়াত করতে পারে। তবে পাম অয়েল মাফিয়া এবং চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য রুখতে ইন্দোনেশিয়াকে আরও অনেক কঠোর হতে হবে।

৪. নেপাল: বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার অনুপ্রেরণামূলক গল্প

নেপাল হলো সেই দেশ যা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ছোট দেশ হয়েও বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে যখন বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, তখন নেপাল ছিল প্রথম দেশ যারা সেই লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের আগেই অর্জন করেছে। বর্তমানে নেপালে বাঘের সংখ্যা ৩৫৫টি যা ২০১২ সালে ছিল মাত্র ১২১টি। নেপালের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের ‘কমিউনিটি ফরেস্ট্রি’ মডেল।

নেপালের চিতওয়ান, বার্দিয়া এবং পারসা জাতীয় উদ্যানের বাঘেরা আজ নিরাপদ। এখানকার স্থানীয় মানুষেরা বাঘকে কেবল একটি প্রাণী হিসেবে নয় বরং তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখে। বাঘ দেখতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে স্থানীয়দের যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ আবার বনের কাজেই ব্যয় করা হয়। নেপালের বার্দিয়া জাতীয় উদ্যানে বাঘ দেখার হার বর্তমানে ভারতের অনেক পার্কের চেয়েও বেশি। নেপাল সরকার বাঘের চলাচলের জন্য মহাসড়কের নিচে আন্ডারপাস নির্মাণ করেছে যাতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাঘের মৃত্যু না হয়। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই নেপালকে বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশে পরিণত করেছে।

৫. থাইল্যান্ড: ইন্দো–চায়না বাঘের পুনর্জাগরণ

থাইল্যান্ডে বর্তমানে ১৮৯টি বাঘ রয়েছে যা দেশটিকে পঞ্চম অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু গত ১৫ বছরে থাইল্যান্ড তাদের বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। থাইল্যান্ডের ‘ওয়েস্টার্ন ফরেস্ট কমপ্লেক্স’ যা মূলত হুয়া খা খায়েং এবং মায়ে ওং বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত, সেখানে বাঘের সংখ্যা উল্লেখজনক হারে বাড়ছে।

থাইল্যান্ডের এই সাফল্যের মূল কারণ হলো তাদের উন্নত টহল ব্যবস্থা যাকে বলা হয় ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’। বন রক্ষীরা জিপিএস এবং বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে বনের প্রতিটি কোণ পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়াও থাইল্যান্ডের হুয়া খা খায়েং অভয়ারণ্যে বাঘের কৃত্রিম প্রজনন এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে যা বাঘের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। থাইল্যান্ডের বাঘেরা মূলত ইন্দো–চায়না প্রজাতির যারা ঘন এবং আর্দ্র বনাঞ্চলে থাকতে পছন্দ করে। থাইল্যান্ডের বন বিভাগ বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলেও বাঘের বিস্তার ঘটানোর পরিকল্পনা করছে।

৬. ভুটান: হিমালয়ের উঁচু পাহাড়ের বাসিন্দা বেঙ্গল টাইগার

ভুটান হলো বিশ্বের অন্যতম পরিবেশবান্ধব দেশ যেখানে সংবিধান অনুযায়ী অন্তত ৬০ শতাংশ বনভূমি থাকা বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভুটানে বাঘের সংখ্যা ১৫১টি। ভুটানের বাঘেরা এক অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কারণ তারা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই উচ্চতায় প্রবল শীত এবং তুষারপাতের মধ্যেও বেঙ্গল টাইগারের টিকে থাকা বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

রয়েল মানাস এবং জিগমে ডোরজি জাতীয় উদ্যান হলো ভুটানের বাঘের প্রধান আবাস। ভুটানে বাঘকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয় এবং তাদের লোকগাথায় বাঘের অবস্থান অনেক উপরে। ভুটান তার বনের মাঝ দিয়ে কোনো বড় সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ করে না যা বাঘের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করে। ভুটানের এই ছোট বাঘের সংখ্যা অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং তারা ভারতের আসামের বনাঞ্চলের সাথে একটি প্রাকৃতিক করিডোর তৈরি করে রেখেছে যা জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক।

৭. মালয়েশিয়া: এক চরম সংকটের মুখে মালয় বাঘ

মালয়েশিয়ার বাঘের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১৫০টি। মালয়েশিয়ার জাতীয় প্রতীকে বাঘের ছবি থাকলেও বাস্তবে এই প্রাণীটি সেখানে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। মালয় প্রজাতির এই বাঘগুলো মূলত তামান নেগারা এবং বেলুম-তেমেঙ্গর বনাঞ্চলে বাস করে। মালয়েশিয়ার বনভূমি ধ্বংস এবং আফ্রিকান চোরা শিকারিদের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ বাঘের সংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারণ।

মালয়েশিয়া সরকার বর্তমানে ‘সেভ দ্য মালয়ান টাইগার’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাঘ রক্ষায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। তারা বাঘের প্রজননের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করেছে যেখানে মানুষের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে মালয়েশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বনের ভেতরের অবৈধ বসতি এবং খনি খনন। যদি আগামী এক দশকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তবে মালয়েশিয়া থেকে বাঘ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৮. বাংলাদেশ: সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী বেঙ্গল টাইগার

বাংলাদেশ এবং বাঘ একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের নাম শুনলেই সারাবিশ্বের মানুষের চোখে ভাসে ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’-এর ছবি। ২০২৫ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ১৪৬। বাংলাদেশের বাঘের একমাত্র এবং প্রধান আবাসস্থল হলো বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এবং শরণখোলা রেঞ্জজুড়ে থাকা এই সুন্দরবনই বাঘের শেষ ভরসা।

সুন্দরবনের বাঘেরা পৃথিবীর অন্যান্য বাঘের তুলনায় অনেক বেশি সংগ্রামী। তারা লবণাক্ত পানির পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এবং দীর্ঘ পথ সাঁতরে পার হতে পারে। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বড় সাফল্য হলো সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করা। এক সময় জলদস্যুদের কারণে বন রক্ষীরা বনের গভীরে নজরদারি করতে পারত না কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশ সরকার ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ ব্যবস্থা চালু করেছে এবং বাঘের শিকার প্রাণী যেমন হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সুন্দরবনের চারপাশ দিয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লোনা পানি বনের আরও ভেতরে ঢুকে পড়ছে যা বাঘের পানযোগ্য মিষ্টি পানির উৎস কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের বাঘের সংখ্যা আগের ১০৬টি থেকে বেড়ে ১৪৬টি হওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি তবে এই ধারা বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

৯. মিয়ানমার ও চীন: টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই

মিয়ানমারে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা মাত্র ২২টি। মূলত হুকাউং উপত্যকা এবং হতামানথি অভয়ারণ্যে এদের বিচরণ দেখা যায়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানে বাঘ সংরক্ষণের কাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কারণে বন রক্ষীরা কাজ করতে পারেন না। তেনাসেরিম করিডোর অঞ্চলে কিছু বাঘের উপস্থিতি দেখা গেলেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

অন্যদিকে তালিকায় দশম অবস্থানে থাকা চীনে বাঘের সংখ্যা মাত্র ২০। এক সময় চীনে প্রচুর বাঘ থাকলেও বর্তমানে তারা মূলত রাশিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। চীন সরকার বর্তমানে উত্তর-পূর্ব চীনে বিশাল একটি ‘ন্যাশনাল পার্ক’ তৈরি করেছে যার আয়তন আমেরিকার ইয়েলোস্টোন পার্কের চেয়েও বড়। চীন বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন এবং রাশিয়ার সাথে বাঘের করিডোর শেয়ার করার মাধ্যমে এই সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীনে বাঘ শিকারের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর হলেও ঐতিহ্যবাহী ঔষধ তৈরির জন্য বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চাহিদা এখনো সেখানে রয়ে গেছে যা সংরক্ষণ কর্মীদের ভাবিয়ে তুলছে।

বাঘের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান

২০২৫ সালের সংকলিত তথ্যানুসারে বিশ্বে বাঘের সংখ্যার বিচারে ভারত এখনো তাদের শীর্ষস্থানটি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ধরে রেখেছে। বর্তমানে দেশটিতে ৩ হাজার ১৬৭টি বাঘ রয়েছে যা বিশ্বের মোট বাঘের সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। ভারতের এই বাঘগুলো মূলত উত্তরাখন্ডের করবেট এবং রাজাজি, মধ্যপ্রদেশের কানহা ও বান্ধবগড় এবং পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যার বিস্তৃত সুন্দরবন ও মানস জাতীয় উদ্যানের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে বসবাস করে। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাশিয়ায় বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ৭৫০টি। অত্যন্ত প্রতিকূল ও শীতল আবহাওয়ার দেশ রাশিয়ার সাইবেরিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের দুর্গম বনাঞ্চলগুলো মূলত বিরল সাইবেরীয় বাঘের একমাত্র প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে ৪০০টি বাঘ টিকে আছে যারা মূলত সুমাত্রা দ্বীপের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশের দেশ নেপালে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ৩৫৫টি যেখানে চিতওয়ান এবং বার্দিয়া জাতীয় উদ্যান তাদের প্রধান আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে তালিকার পরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে বর্তমানে ১৮৯টি বাঘ রয়েছে যাদের বিচরণ মূলত দেশটির ওয়েস্টার্ন ফরেস্ট কমপ্লেক্সের সংরক্ষিত এলাকায়। ভুটান তার বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫১-তে নিয়ে এসেছে যারা রয়েল মানাস এবং জিগমে ডোরজির মতো উঁচু পাহাড়ি বনভূমিতে বিচরণ করে। মালয়েশিয়ার বাঘের পরিস্থিতি কিছুটা সংকটাপন্ন হলেও দেশটিতে এখন ১৫০টি বাঘ রয়েছে যারা মূলত তামান নেগারা এবং বেলুম-তেমেঙ্গর বনাঞ্চলে বাস করে। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ১৪৬টি যাদের মূল আবাসস্থল হলো বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ। তালিকার শেষের দিকে থাকা মিয়ানমারে বর্তমানে ২২টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে যারা মূলত হুকাউং উপত্যকা এবং তেনাসেরিম করিডোরে বাস করে। সবশেষে চীনে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ২০টি যা দেশটির জিলিন ও হেইলংজিয়াং প্রদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এলাকার গভীর জঙ্গলে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বাঘ সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

২০২৫ সালে বাঘ সংরক্ষণ কেবল বন্দুক হাতে বন পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাঘ সংরক্ষণের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এখন ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বাঘের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা হয়। প্রতিটি বাঘের ডোরাকাটা দাগ মানুষের আঙুলের ছাপের মতো আলাদা তাই ক্যামেরার ছবি থেকে সহজেই প্রতিটি বাঘকে আলাদাভাবে চেনা সম্ভব।

এছাড়াও বর্তমানে বাঘের গলার ‘রেডিও কলার’ পরিয়ে তাদের গতিবিধি এবং তারা কোন এলাকায় বেশি সময় কাটায় তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে বাঘের প্রজনন ক্ষেত্র এবং শিকারের ধরন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সঠিক তথ্য পান। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে বনের দুর্গম এলাকাগুলোতে নজরদারি চালানো হচ্ছে যেখানে বন রক্ষীদের যাওয়া কঠিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বর্তমানে বাঘের ডাক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে যা থেকে বোঝা যায় বাঘটি কোনো বিপদে আছে কি না। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা বাঘের মতো বিপন্ন প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখছে।

বাঘের অস্তিত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তন: এক অনিবার্য সংঘাত

২০২৫ সালে এসে বাঘের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বাঘেরা সরাসরি এই হুমকির সম্মুখীন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে যা বাঘের আবাসন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে। এছাড়াও চরম আবহাওয়া যেমন ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বনের বাস্তুতন্ত্র বদলে যাচ্ছে। শিকারি প্রাণীদের সংখ্যা কমে গেলে বাঘ লোকালয়ে আসতে শুরু করে যা মানুষ ও বাঘের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। বাঘ সংরক্ষণে সফল হতে হলে আমাদের অবশ্যই বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে এবং বনের চারপাশের বাফার জোনগুলোকে রক্ষা করতে হবে। বাঘ কেবল ডাঙার প্রাণী নয় এটি আমাদের ধরিত্রীর ফুসফুসকে রক্ষা করার এক অপরিহার্য উপাদান।

আমাদের ভবিষ্যৎ এবং বাঘের গর্জন

পরিশেষে বলা যায়, বাঘের অস্তিত্ব টিকে থাকা মানেই মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকা। আমরা যদি বাঘকে রক্ষা করতে পারি, তবেই আমরা আমাদের বনাঞ্চল, নদী এবং বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করতে পারব। ২০২৫ সালের এই তথ্যগুলো আমাদের একদিকে যেমন আশাবাদী করে তোলে, অন্যদিকে আমাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ভারত বা নেপালের মতো দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ধ্বংসের মুখ থেকে কোনো প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের সুন্দরবন আমাদের অহংকার এবং এই বনের বাঘদের রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

পাঠকপ্রিয়