নদীকে বলা হয় পৃথিবীর ধমনি। মানবদেহে ধমনি যেমন রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি পৃথিবীর বুকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে এই গ্রহের প্রাণবৈচিত্র্য ও সজীবতা। আদিমকাল থেকেই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একের পর এক সভ্যতা। পানীয় জল, কৃষিকাজের জন্য সেচের ব্যবস্থা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হিসেবে নদী মানব সভ্যতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে যুগে যুগে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, নীল নদ কিংবা সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন সভ্যতাগুলো তাদের অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণরূপে নদীর ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু নদীর ইতিহাস কি কেবল মানব সভ্যতার সমসাময়িক? মোটেও নয়। মানুষের জন্ম বা সভ্যতার বিকাশের কোটি কোটি বছর আগে থেকেই পৃথিবীর বুকে বয়ে চলেছে নদী। অবিরাম এই জলধারা পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী।
নদীর সঠিক বয়স নির্ধারণ করা বা ঠিক কত বছর আগে একটি নদীর পথচলা শুরু হয়েছিল, তা সঠিকভাবে অনুমান করা ভূতাত্ত্বিকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কারণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তনশীল এবং এর প্রবাহের ইতিহাস পাথরের স্তরে চাপা পড়ে থাকে। তবুও আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা কিছু নদীর বয়স সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। বিশ্বে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি নদী রয়েছে, যদিও এই সংখ্যাটি নির্ভর করে নদীকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তার ওপর। সাধারণত নীল নদকে বিশ্বের দীর্ঘতম নদী, আমাজনকে সর্বাধিক পানি বহনকারী নদী এবং কঙ্গো নদীকে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর নদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে প্রাচীনত্বের, তখন তালিকাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নদী কোনগুলো, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও ভূতাত্ত্বিক গঠন ও কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা একটি সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করেছেন। ধারণা করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন নদীটি হলো অস্ট্রেলিয়ার ফিঙ্ক, যা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি বছরের পুরোনো। আজ আমরা জানব পৃথিবীর এমনই ১০টি প্রাচীন নদী সম্পর্কে, যেগুলো কোটি কোটি বছর ধরে নিজস্ব গতিতে বয়ে চলেছে।
১. ফিঙ্ক নদী: অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির আদি সাক্ষী

পৃথিবীর প্রাচীনতম নদীর তালিকায় প্রথমেই উঠে আসে অস্ট্রেলিয়ার ফিঙ্ক নদীর নাম। ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা, এই নদীটির বয়স প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি বছর। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা ইনডিজেনাস জনগণ এই নদীকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করে এবং তারা একে ‘লারাপিনটা’ নামে ডাকে। ফিঙ্ক নদীর ভৌগোলিক অবস্থান এবং এর প্রবাহের ধরন একে বিশ্বের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা করেছে। এটি সব সময় প্রবহমান থাকে না। বর্তমানে কেবল ভারী বৃষ্টিপাত হলেই নদীটিতে পানির প্রবাহ দেখা যায় এবং সেই পানি লেক আইয়ার বেসিনে গিয়ে পড়ে। বছরের বেশির ভাগ সময় এটি শুষ্ক থাকে এবং মরুভূমির বুকে একটি রেখা হিসেবে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়।
ফিঙ্ক নদীর প্রাচীনত্বের প্রমাণ মেলে অস্ট্রেলিয়ার ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে এর গভীর সংযোগে। ধারণা করা হয়, অস্ট্রেলিয়ায় ‘অ্যালিস স্প্রিংস ওরোজেনি’ গড়ে ওঠার আগে থেকেই ফিঙ্ক নদী প্রবাহিত হচ্ছে। অ্যালিস স্প্রিংস ওরোজেনি হলো একটি বিশেষ ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ, পাহাড় সৃষ্টির আগে থেকেই এই নদী সেখানে বিদ্যমান ছিল, যা এর প্রাচীনত্বের এক অকাট্য প্রমাণ।
২. মিউজ নদী: ইউরোপের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের ধারক

ইউরোপ মহাদেশের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মিউজ নদী এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির বয়স ধারণা করা হয় ৩২ থেকে ৩৪ কোটি বছর। ইউরোপের ভূপ্রকৃতি গঠনে মিউজ নদীর ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে ইউরোপে পাহাড় গঠনের প্রাথমিক যুগ, যা ‘হার্সিনিয়ান ওরোজেনি’ নামে পরিচিত, সেই সময়কালে এই নদী ভূপ্রকৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মিউজ নদীর উৎস ফ্রান্সের মালভূমি থেকে। সেখান থেকে এটি আঁকাবাঁকা পথে আর্দেনেস বন অতিক্রম করে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে নর্থ সি বা উত্তর সাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে নদীটি দেখেছে ইউরোপের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির নানা পরিবর্তন। ঐতিহাসিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও মিউজ নদী ইউরোপের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ।
৩. ফ্রেঞ্চ ব্রড নদী: উত্তর আমেরিকার এক বিস্ময়

উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন নদী হিসেবে স্বীকৃত ফ্রেঞ্চ ব্রড নদী। এর বয়সও মিউজ নদীর মতোই ৩২ থেকে ৩৪ কোটি বছর বলে ধারণা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে শুরু হয়ে টেনেসির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি অ্যাপ্যালাচিয়ান পাহাড় অতিক্রম করেছে। এই নদীটির প্রবাহের দিক এবং এর গঠনশৈলী একে অনন্য করে তুলেছে।
অন্যান্য সাধারণ নদীর তুলনায় ফ্রেঞ্চ ব্রড নদীর একটি বিশেষত্ব হলো, এটি দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়, যা সচরাচর দেখা যায় না। নদীটির আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল নেটওয়ার্ক। চার হাজার মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত অসংখ্য শাখা নদী ও জলধারা জালের মতো এসে ফ্রেঞ্চ ব্রড নদীতে মিলিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রতিবেশী নিউ নদী এবং সাস্কোয়াহানা নদীর সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ব্রড নদীর ভূপ্রাকৃতিক ইতিহাসের গভীর যোগসূত্র রয়েছে, যা এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে।
৪. নিউ নদী: নাম নতুন, কিন্তু ইতিহাস অতি প্রাচীন

নাম ‘নিউ রিভার’ বা নতুন নদী হলেও এটি আসলে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন নদী। অ্যাপ্যালাচিয়ান পাহাড় অতিক্রম করা এই নদীটিকে কমপক্ষে ২৬ থেকে ৩২ কোটি বছরের পুরোনো বলে ধরা হয়। তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এর বয়স আরও বেশি হতে পারে। নদীটি নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে যাত্রা শুরু করে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কানাওয়া নদীতে গিয়ে মিশেছে।
নিউ নদীর সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিস্ময়কর বিষয় হলো, এটি সেই পাহাড়গুলো থেকেও প্রাচীন, যেগুলোর মধ্য দিয়ে এটি প্রবাহিত হচ্ছে। সাধারণত পাহাড় থেকে নদীর উৎপত্তি হয়, কিন্তু নিউ নদীর ক্ষেত্রে নদীটি আগে থেকেই ছিল এবং পাহাড়গুলো পরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। নদীটি পাহাড়ের উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের পথ কেটে প্রবাহিত হয়েছে। আরেকটি আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, নিউ নদী এমন একসময়ে নিজের পথ তৈরি করেছিল, যখন আটলান্টিক মহাসাগরও গঠিত হয়নি। অর্থাৎ, মহাদেশীয় সরণের বা কন্টিনেন্টাল ড্রিফটের আগের পৃথিবীর সাক্ষী এই নদী।
৫. রাইন নদী: জার্মানির গৌরব ও সৌন্দর্যের প্রতীক

ইউরোপের অন্যতম প্রধান এবং ব্যস্ত জলপথ রাইন নদী। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর বয়স প্রায় ২৪ কোটি বছর। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এটি ট্রায়াসিক যুগের সময় গঠিত হতে শুরু করে এবং পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে নিজের পথ তৈরি করে এগিয়ে যায়। রাইন নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি ইউরোপের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজকের দিনে রাইন নদী একটি অত্যন্ত ব্যস্ত বাণিজ্যিক জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। নদীর দুই পারের মনোরম দৃশ্য আর নদীর তীরে একের পর এক প্রাচীন দুর্গ রাইনের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। রাইন নদীর একটি অনন্য বিষয় হলো, এর প্রবাহের পথ সম্ভবত আলপস পর্বতমালা গঠনের বহু আগে কোনো এক ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছিল। আলপস পর্বতের উত্থান এবং ইউরোপের ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাইন নদীও তার রূপ বদলেছে, কিন্তু এর প্রবাহ থেমে থাকেনি।
৬. সেভ নদী: গন্ডোয়ানা মহাদেশের স্মৃতিচিহ্ন

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ ভাগে অবস্থিত সেভ নদী প্রায় ২০ কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই নদীর জন্ম ইতিহাস পৃথিবীর সুপার মহাদেশ বা প্যানজিয়া ভেঙে যাওয়ার সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাচীন সুপার মহাদেশ ‘গন্ডোয়ানা’ যখন ভেঙে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় থেকেই সেভ নদী প্রবাহিত হতে শুরু করে।
নদীটি জিম্বাবুয়ে ও মোজাম্বিক অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। সেভ নদীর অববাহিকা বা সেভ ভ্যালি জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য আধার। এখানে বিচিত্র সব উদ্ভিদ ও বিরল প্রাণীর দেখা মেলে, যা এই অঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেভ নদী কেবল পানিই বহন করে না, এটি আফ্রিকা মহাদেশের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাসও বহন করে চলেছে।
৭. নর্মদা নদী: ভারতের হৃদস্পন্দন

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম পবিত্র এবং প্রাচীন নদী নর্মদা। ভারতের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির বয়স প্রায় ১৬ কোটি বছর। ভারতে গঙ্গা, যমুনা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো বেশ কয়েকটি বড় নদী থাকলেও নর্মদার ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি ভারতের অন্যান্য প্রধান নদীর মতো পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েনি, বরং এটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। প্রাচীন মহাদেশ গন্ডোয়ানা ভেঙে যাওয়ার সময় নর্মদা নদীর গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নর্মদা নদী একটি গভীর ফাটলযুক্ত উপত্যকা বা রিফ্ট ভ্যালি দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নদীর তীরে এবং উপত্যকায় অনেক প্রাগৈতিহাসিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যা ভারতের প্যালিওন্টোলজির জন্য এক বিশাল ভান্ডার। নর্মদা কেবল একটি নদী নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
৮. আমুর দরিয়া: বরফ ও বনের মিতালি

এশিয়ার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত আমুর দরিয়া বা আমুর নদীর বয়স প্রায় ১২ কোটি বছর। এই নদীটি পূর্ব সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রাশিয়া ও চীনের দীর্ঘ সীমান্ত অতিক্রম করেছে। আমুর নদী এমন এক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে, যেখানে প্রকৃতির রুদ্র ও শান্ত—উভয় রূপই দেখা যায়। নদীটি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও সমৃদ্ধ প্রাণিজগৎকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
শীতকালে আমুর নদীর পানি জমে বরফে পরিণত হয়, যা এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করে। তখন নদীর ওপর দিয়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। মাছ ধরার জন্য আমুর দরিয়া বিখ্যাত, বিশেষ করে স্টুর্জন ও স্যামন মাছের জন্য এটি পরিচিত। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিবহন ও জীবিকা নির্বাহে এই নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে হাজার বছর ধরে। রাশিয়া ও চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমুর নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
৯. ম্যাকলাই নদী: অস্ট্রেলিয়ার রেইনফরেস্টের প্রাণ

অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি প্রাচীন নদী হলো ম্যাকলাই। ধারণা করা হয়, এই নদীটি প্রায় আট কোটি বছরের পুরোনো। ম্যাকলাই নদীর উৎপত্তি এবং প্রবাহের ইতিহাস অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রেট এসকারপমেন্ট’ বা বিশাল খাড়া পাহাড়ি অঞ্চল গঠিত হওয়ার আগের। এটি গভীর খাঁড়ি ও চিরহরিৎ বনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা একে এক রহস্যময় সৌন্দর্য দান করেছে।
ম্যাকলাই নদীর তীরে বিচিত্র সব উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায়, যা অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় বনভূমির বা রেইনফরেস্টের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। এই নদীর অববাহিকায় এমন কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী টিকে আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও সচরাচর দেখা যায় না। পরিবেশবিদদের কাছে ম্যাকলাই নদী এবং এর আশপাশের অঞ্চল গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
১০. কলোরাডো নদী: গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের স্থপতি

তালিকার দশম স্থানে রয়েছে উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত কলোরাডো নদী। এই নদীটির বয়স প্রায় সাত কোটি বছর। কলোরাডো নদীর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’-এর দৃশ্য। বস্তুত, এই কলোরাডো নদীই কোটি কোটি বছর ধরে পাথর কেটে তৈরি করেছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো বিস্ময়কর প্রাকৃতিক কাঠামো।
কলোরাডো নদী রকি মাউন্টেইন থেকে শুরু হয়ে ইউটাহ ও অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্য অতিক্রম করে মেক্সিকো সীমান্তের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এটি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর বিশাল অবদান রয়েছে। পরিবহন, কৃষিকাজে সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কলোরাডো নদীর ওপর নির্ভর করে কোটি মানুষ। তবে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বর্তমানে এই প্রাচীন নদীটি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, যা পরিবেশবিদদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ কথা
ফিঙ্ক থেকে কলোরাডো—এই নদীগুলো কেবল জলধারা নয়, এগুলো পৃথিবীর ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত দলিল। ডাইনোসরের যুগের আগে থেকে শুরু করে মহাদেশগুলোর ভাঙা-গড়া, তুষারযুগ এবং মানুষের আবির্ভাব—সবকিছুর সাক্ষী হয়ে আজও বয়ে চলেছে এই নদীগুলো। প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমন নদীর ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল, তেমনি আজকের আধুনিক সভ্যতাও নদীর কাছে ঋণী। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে এই প্রাচীন নদীগুলো আজ হুমকির মুখে। পৃথিবীর এই ধমনিগুলোকে রক্ষা করা তাই আমাদের অস্তিত্বেরই স্বার্থে জরুরি।