সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সান্তা ক্লজ কেন লাল পরেন? নেপথ্যে ১৯৩১ সালের এক বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বড়দিন মানেই সান্তা ক্লজ। আর সান্তা ক্লজের কথা ভাবলেই মানসপটে ভেসে ওঠে হাসিখুশি, গোলগাল, দাড়িওয়ালা এক দয়ালু বৃদ্ধের ছবি। যাঁর গায়ে উজ্জ্বল লাল কোট, সাদা ফার আর কালো বেল্ট। আমাদের কল্পনায় এই লাল সান্তা এমনভাবে গেঁথে গেছে যে মনে হয় সান্তা বুঝি চিরকালই লাল পোশাক পরতেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। একসময় সান্তাকে নীল, সবুজ, বাদামিসহ নানা রঙের পোশাকেই দেখা যেত। প্রশ্ন জাগে, তাহলে এখন কেন তিনি শুধুই লাল?

এই প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসে জনপ্রিয় পানীয় ব্র্যান্ড কোকা-কোলার নাম। ১৯৩১ সালে কোকা-কোলা তাদের ক্রিসমাসের বিজ্ঞাপনে এমন এক সান্তাকে সামনে নিয়ে আসে, যিনি কোনো ভয়ংকর রূপকথার চরিত্র নন, বরং একেবারে ঘরের মানুষ। উষ্ণ, বন্ধুসুলভ, হাত বাড়ালেই যেন হেসে কথা বলবেন—এমন এক অবয়ব। যদিও ১৮০০ সালে কার্টুনিস্ট থমাস ন্যাস্ট সান্তা ক্লজকে লাল পোশাকে এঁকেছিলেন, তবে সেই আইডিয়াকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করার কাজটি করে কোকা-কোলা। ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠানটি আর্টিস্ট হেডন সানডব্লমকে দিয়ে তাদের ব্র্যান্ড কালারের সঙ্গে মিলিয়ে বন্ধুসুলভ লাল স্যুট পরা এক সান্তাকে আঁকায়।

এরপর ম্যাগাজিন, পোস্টার, বিলবোর্ড ও দোকানের ডিসপ্লেতে বিশ্বজুড়ে কোকা-কোলা সেই প্রচারণা চালায়। ১৯৩১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত কোকা-কোলার সেই বিজ্ঞাপনগুলো পরবর্তীতে লাল-সাদা স্যুটে বিশ্বজুড়ে সান্তার আজকের ইমেজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বছরের পর বছর একই পোশাকের পুনরাবৃত্তি হতে হতে লাল সান্তাই হয়ে উঠল সান্তা ক্লজের সমার্থক।

তবে সান্তা ক্লজের মূল গল্পের শুরুটা সেইন্ট নিকোলাস নামের এক বিশপকে ঘিরে। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় ২৮০ সালের দিকে এশিয়া মাইনর বা বর্তমান তুরস্কের পাতারা অঞ্চলে তাঁর জন্ম হয়েছিল। সততা, দয়া ও মহানুভবতার জন্য তিনি মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন। গরিব-দুঃখী ও অসহায় মানুষদের সাহায্য করতেন তিনি। বিশেষ করে শিশুদের প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন নিকোলাস। জনশ্রুতি আছে, একবার নিকোলাস দাস হিসেবে বিক্রি হতে যাওয়া তিন মেয়েকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের বিয়ের যাবতীয় খরচও তিনি বহন করেছিলেন।

বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসতেন নিকোলাস। চুপিচুপি তাদের জন্য উপহার রেখে যেতেন। বাচ্চাদের অবাক করা হাসিমুখ তাঁর খুব পছন্দ ছিল। এই জনদরদী মনোভাবের জন্য একসময় সারা ইউরোপে তাঁর নামে জয়জয়কার শুরু হয়। সেইন্ট নিকোলাস পরিচিতি পেতে থাকেন বাচ্চাদের পরম বন্ধু ও সবার দুর্দিনের সাথী হিসেবে। এভাবেই একসময় সেইন্ট নিকোলাস সারা ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় সেইন্ট হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং অনেকেই মনে করেন, সেইন্ট নিকোলাসই আজকের আধুনিক সান্তা ক্লজ।

লোকগল্প অনুসারে সান্তা উত্তর মেরুতে থাকেন এবং সেখানে বসেই তিনি বাচ্চাদের চিঠি পড়েন। মজার ব্যাপার হলো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ডাকঘরে নর্থ পোলের একটি ঠিকানা আছে সান্তাকে চিঠি পাঠানোর জন্য। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ক্রিসমাস উপলক্ষে উপহার বিনিময় এক ধরনের সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এই উপহার বিনিময় প্রথা চালু করতে প্রচুর বিনিয়োগ শুরু করে, যা দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শপিং মলগুলোতে বিশাল আকারের ক্রিসমাস ট্রি, সান্তা ক্লজ ও আলোকসজ্জা দিয়ে এমনভাবে সাজানো হয়, যেন সবার মনেই উৎসবের আমেজ চলে আসে।

এই উৎসবমুখর পরিবেশই মানুষকে কেনাকাটার জন্য প্রভাবিত করে। দোকানে দোকানে বিক্রি হতে থাকে নানা ডিজাইনের কুকি, বাহারি পোশাক, সান্তার লাঠির আদলে তৈরি ক্যান্ডি কেইন, নানা রকম চকলেটের বাহার আর গিফট সামগ্রী। এক কথায়, এটি এখন বিশাল ব্যবসায়িক যজ্ঞ। বর্তমানে ক্রিসমাসের আনন্দ ও উদযাপনের ঢং অনেক উন্নত হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ব্যবসাও বেড়েছে বহুগুণ। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, উৎসবের এই জৌলুসে সেইন্ট নিকোলাসের সেই ত্যাগ ও মানবিকতার আদর্শ এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে।

পাঠকপ্রিয়