‘জীবনে প্রথম কোনো রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনে সরাসরি টাকা দিলাম। কিন্তু এটা কোনো দলকে নয়, একজন ব্যক্তিকে।’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে টাকা পাঠানোর ডিজিটাল রসিদসহ এমন পোস্ট দিয়েছেন মাহমুদুল হাসান নামের এক ব্যক্তি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এমন গণচাঁদা বা ‘ক্রাউডফান্ডিং’ সংগ্রহের চিত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ চোখে পড়ছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন হলেও উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোতে এর রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। প্রার্থীদের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলছে। তবে নির্বাচনের তফসিল ও প্রচারণার সময়সীমার আগে এভাবে টাকা তোলা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, মূলত নতুন নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাই ক্রাউডফান্ডিং করছেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চান। যার টাকা আছে, সেই সংসদে যাবে বা নীতিনির্ধারক হবে—এমন প্রথা ভাঙতেই এই উদ্যোগ। এখন পর্যন্ত ক্রাউডফান্ডিংয়ে সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী ও ঢাকা-৯ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী তাসনিম জারা। গত বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি জানান, মাত্র ২৯ ঘণ্টায় সাধারণ মানুষ তাঁকে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য ৪৭ লাখ টাকা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন মাধ্যম ইনভেস্টোপিডিয়ার তথ্যমতে, বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন কোনো উদ্যোগের জন্য অল্প করে অর্থ প্রদান করেন, তখন তাকে ক্রাউডফান্ডিং বলা হয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে ছোট ব্যবসাগুলো এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর উদাহরণ বেশ পুরনো। একশ বছরেরও বেশি আগে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের জন্য ‘তিলক স্বরাজ তহবিল’ গঠন করেছিলেন। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ম্যারিলিওন অনলাইনে ভক্তদের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে সফল ক্রাউডফান্ডিংয়ের সূচনা করে।
রাজনীতিতে এই পদ্ধতির ব্যবহার বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার ৬৯ শতাংশ তহবিল ক্ষুদ্র দাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। ভারতের আম আদমি পার্টির নেত্রী ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশী মার্লেনা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের খরচ মেটাতে ৪০ লাখ রুপির গণতহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। এমনকি ভারতের কংগ্রেস দলও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘ডোনেট ফর দেশ’ নামে এমন অভিযান চালিয়েছে।
বাংলাদেশে এতদিন রাজনৈতিক দলগুলো বড় গোষ্ঠীর কাছ থেকে গোপনে অর্থ নিত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় টাকা তুলছেন তরুণ প্রার্থীরা।
তবে এই প্রক্রিয়ায় আইনি প্রশ্নও উঠছে। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫ এর বিধি ১৮ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের তিন সপ্তাহ আগে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার শুরু করা যাবে না। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে টাকা চাওয়া প্রচারণার কৌশল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, দেশে এর আগে কখনো ক্রাউডফান্ডিংয়ের বিষয়টি দেখা যায়নি। ফলে এটি আচরণবিধির লঙ্ঘন কি না বা প্রচারণার অংশ কি না, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একটি ব্যাখ্যা দিতে পারে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, ক্রাউডফান্ডিং একটি নতুন প্রচেষ্টা। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কালো টাকার প্রভাব ও প্রতিপত্তিমুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে। তবে যারা ক্রাউডফান্ডিং করছেন, তাঁদের অবশ্যই স্বচ্ছ থাকতে হবে। আয় এবং ব্যয়ের সঠিক হিসাব দিতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আয়ের উৎস দেখানো বাধ্যতামূলক। যুক্তরাজ্যের দি ইলেকট্রোরাল কমিশনের মতো বাংলাদেশেও গণতহবিলের ক্ষেত্রে অর্থ কাকে এবং কেন দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।