স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে দেশের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। এর বদলে গঠিত হতে যাচ্ছে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর’। প্রস্তাবিত এই নতুন অধিদপ্তরের একটি শাখার অধীনে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যুক্ত করার উদ্যোগে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন এই খাতের প্রায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের আশঙ্কা, এই একীভূতকরণের ফলে মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত সাফল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের এক বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরেন। সেখানে জানানো হয়, বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনাকারী সাতটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে তিনটি মূল অধিদপ্তর গঠন করা হবে। এর মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের জন্য আলাদা একটি অধিদপ্তর গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অধীনে থাকা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরটি বিলুপ্ত হলে এর কার্যক্রম প্রস্তাবিত নতুন অধিদপ্তরের অধীনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে চলে যাবে। তখন মহাপরিচালকের পরিবর্তে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক দিয়ে এই সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা বা মতামত ছাড়াই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ ঘটনার পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনসহ একাধিক কর্মী সংগঠন ইতোমধ্যে দুই দফায় স্মারকলিপি দিয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জানান, ১৯৬৫ সাল থেকে পরিচালিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাফল্য অর্জন করেছে। কোনো সমীক্ষা ছাড়াই ফের একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন, এর আগে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত উপজেলা ও এর নিম্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একীভূত করা হয়েছিল। সে সময় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, সেবার মানের অবনতি এবং মাঠপর্যায়ে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি দুটি বিভাগ আবার আলাদা করা হয়।
বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৫০০ পরিবার কল্যাণ সহকারী, ৪ হাজার ৫০০ পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, ৬ হাজারের বেশি পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এবং প্রায় আড়াই হাজার উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা রয়েছেন। এই কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছেন।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ফলে দেশে একসময় মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ৬ দশমিক ৫ থেকে নেমে ২০২৪ সালে ২ দশমিক ৩-এ আসে। তবে সামগ্রী সংকটের কারণে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অধিদপ্তর একীভূত হলে মাঠপর্যায়ের সেবা আরও ব্যাহত হবে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
অন্যদিকে একীভূতকরণের পক্ষে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আলাদা রাখার কারণে সমন্বয়হীনতা ও কাজের পুনরাবৃত্তি বেড়েছে। দুই ভাগে বিভক্ত থাকায় কার্যকারিতা কমেছে। তাই স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একীভূত করাই যুক্তিযুক্ত। তবে আগে কাজের পরিধি ঠিক করে নেওয়া ভালো।
অধ্যাপক হামিদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সমিতির আহ্বায়ক মো. সোহেল হোসেন বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আলাদা রেখেও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো সম্ভব। আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, অধিদপ্তর একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে সেবা কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করা এবং কার্যক্রমে সমন্বয় নিশ্চিত করা।