দীর্ঘ ৪৪ বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে অবশেষে পাশাপাশি শায়িত হচ্ছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক দম্পতি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে (চন্দ্রিমা উদ্যান) তাঁর স্বামী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। এরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে স্বামীর কবরের পাশে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার তাতে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ঘোষণা দেয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমে তাঁকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পাহাড় এলাকায় গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকে দেহাবশেষ ঢাকায় এনে শেরেবাংলা নগরের বর্তমান স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ জানান, জিয়াউর রহমানকে সংসদ ভবন এলাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের সিদ্ধান্তটি এসেছিল তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকেই। যদিও ওই স্থানটির নাম নিয়ে পরবর্তীতে নানা রাজনীতির খেলা চলেছে। এরশাদ সরকারের আমলে নাম হয় ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’, বিএনপি আমলে ‘জিয়া উদ্যান’, আবার আওয়ামী লীগ আমলে ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’ নাম ফিরে এলেও বর্তমানে সেখানকার সাইনবোর্ডে ‘জিয়া উদ্যান’ নামই দেখা যাচ্ছে।
তৎকালীন আবদুস সাত্তার মন্ত্রিসভার উপমন্ত্রী এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বিবিসি বাংলাকে জানান, জিয়াউর রহমানের জানাজা ও দাফনের স্থান নির্বাচনের প্রস্তাবটি ছিল বিচারপতি আবদুস সাত্তারের। মন্ত্রিপরিষদ তা সর্বসম্মতভাবে চূড়ান্ত করে এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদও তাতে সমর্থন দেন। রুহুল আমিন হাওলাদারের মতে, যেহেতু জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাই জাতীয় সংসদ ভবনের কাছেই তাঁকে দাফনের চিন্তা করা হয়েছিল। ওই জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিল।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানকারীরা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর ১ জুন জিয়াউর রহমানের মরদেহ খুঁজতে বের হন তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ (প্রয়াত বিএনপি নেতা)। তিনি কাপ্তাই রাস্তার পাশে গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি নতুন কবরের সন্ধান পান। সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
১৯৮১ সালের ২ জুন তৎকালীন সংবাদ সংস্থা এনা ও দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে বলা হয়েছিল, ২ জুন বেলা সাড়ে ১২টায় মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে নতুন সংসদ ভবনের পাশের লেকের ধারে প্রয়াত নেতার মরদেহ দাফন করা হয়। সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতেই আজ বুধবার স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হচ্ছেন স্ত্রী খালেদা জিয়া।