বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন তাঁর নাতনি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাবার সঙ্গে দেশে ফিরে দাদির মৃত্যুশয্যা থেকে শুরু করে দাফন এবং পরবর্তী কূটনৈতিক বৈঠকগুলোতে বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত জাইমা রহমান বাবার পাশে থেকে যেভাবে শোক ও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, তা অনেকের কাছেই দাদি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হচ্ছে।
ব্যারিস্টারি শেষে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান দম্পতির একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান দাদির বিদায়লগ্নে বাবার প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে পাশে ছিলেন। খালেদা জিয়ার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হোক কিংবা বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক—সবখানেই তাঁকে বাবার পাশে দেখা গেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে খালেদা জিয়ার জানাজার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা যখন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন জাইমা রহমানকে বাবার ঠিক পরের আসনেই দেখা গেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর যখন তারেক রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দিচ্ছিলেন, তখন জাইমা ছিলেন তাঁর ঠিক পাশেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম এ বিষয়ে বলেন, দেশে তরুণ নেতৃত্বের জোয়ার চলছে। তারেক রহমান নিজেও তরুণদের রাজনীতিতে প্রাধান্য দিচ্ছেন। জিয়া পরিবার থেকে জাইমা রহমানকেও রাজনীতিতে প্রত্যাশা করছেন অনেকে। ফলে সামনের দিনে জাইমা রহমান রাজনীতিতে যুক্ত হবেন এবং দাদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবেন, এমন ধারণা অমূলক নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন। জাইমা রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দলীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়াও একইভাবে তারেক রহমানকে রাজনীতির ময়দানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী থানা কমিটির সদস্য হওয়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া ছেলেকে নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর এবং খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সফরে তারেক রহমান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ছিলেন। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতির শীর্ষে ওঠার এই নজির বিশ্ব রাজনীতিতেও অত্যন্ত পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ ও জর্জ ওয়াকার বুশ, কানাডার পিয়েরে ট্রুডো ও জাস্টিন ট্রুডো, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী কিংবা পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ এবং বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল উট্টো—সবারই রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটেছে বাবা বা মায়ের হাত ধরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে।
২৯ বছর বয়সী জাইমা রহমান যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক এবং ২০১৯ সালে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে বার অ্যাট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফেরার আগে গত ২৩ নভেম্বর তিনি প্রথমবারের মতো বিএনপির একটি দলীয় সভায় ভার্চুয়ালি অংশ নেন। ওই বৈঠকে ঢাকা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে জাইমা রহমান প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেন এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এছাড়া গত বছরের শুরুতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অংশ নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ বার্তা দিয়েছিলেন।
সম্প্রতি জাইমা রহমান ফেসবুকে দাদির সঙ্গে চায়ের টেবিলে আলাপে মগ্ন একটি ছবি শেয়ার করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদায়-বেলায়’ কবিতার পঙক্তিমালা জুড়ে দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, লন্ডনের দিনগুলো আমাকে বাস্তববাদী করেছে, একটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে শিখেছি মানুষের সমস্যার যৌক্তিক ও আইনগত সমাধান খোঁজা। তিনি আরও লেখেন, আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায় প্রিয় বাংলাদেশকে নতুন করে জানতে চাই। দাদুর কাছেই আমি নেতৃত্বের প্রথম শিক্ষা পাই—নম্রতা, আন্তরিকতা আর মন দিয়ে শোনার মানসিকতা।
অবশ্য দেশে ফেরার আগে গত অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, সময় এবং পরিস্থিতিই তা বলে দেবে। তবে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও জাইমা রহমানের সরব উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন।