২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের একটি বড় অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনার প্রায় দেড় বছর হতে চললেও পলাতক ৭১৩ জন বন্দির কোনো হদিস মেলেনি, যাদের মধ্যে দুর্ধর্ষ অপরাধী ও জঙ্গিরাও রয়েছেন। একই সঙ্গে কারাগার থেকে লুট হওয়া ৬৭টি অস্ত্রের মধ্যে ২৭টি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যার মধ্যে রয়েছে চাইনিজ রাইফেল ও শটগানের মতো মারণাস্ত্র। এসব অস্ত্র ও পলাতক বন্দিরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগারে বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। ওই সময় নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের সব বন্দি পালিয়ে যান। সব মিলিয়ে তখন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো ৭১৩ জন ফেরারি। অন্যদিকে লুট হওয়া অস্ত্রের ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ ২৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, কারাগার থেকে যেসব বন্দি পালিয়েছে, তাঁদের সবাইকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং তাঁদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিলেন। তাঁরা খুব সহজ প্রকৃতির অপরাধী নন। এসব অপরাধী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বা কারও হয়ে টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁদের আইনের আওতার আনার পাশাপাশি বাকি সাজা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঘটনার পরিক্রমা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সর্বপ্রথম নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে কারাগারে হামলা চালিয়ে সেলের তালা ভেঙে দিলে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৯ জনসহ মোট ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যান। এরপর ৬ আগস্ট বিকেলে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দিরা বিদ্রোহ করেন। দেয়াল টপকে ২০৯ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, এ সময় নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে ৬ জন নিহত হন। এছাড়া ৮ আগস্ট জামালপুর কারাগারে বিদ্রোহ দেখা দিলে গোলাগুলিতে ৬ জন নিহত হন, তবে সেখান থেকে কেউ পালাতে পারেননি। সব মিলিয়ে নরসিংদী থেকে ৮২৬, শেরপুর থেকে ৫০০, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০, কুষ্টিয়া থেকে ১০৫ এবং কাশিমপুর থেকে ২০০ ঝুঁকিপূর্ণ বন্দি পালিয়ে যান।
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের ১৭টি কারাগার বিশৃঙ্খলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং বন্দিদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো যাদের ফেরানো যায়নি, তাঁদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্যও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশে বর্তমানে চলমান খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোর পেছনে পালিয়ে যাওয়া এসব দুর্ধর্ষ অপরাধীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। জেল ভেঙে পালানো এসব আসামির হাতে লুট হওয়া অস্ত্র থাকায় তাঁরা বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাচ্ছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।