আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামায় উঠে এসেছে সম্পদের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় চিত্র। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগদ টাকার দিক থেকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমেদ। তাঁর হাতে বর্তমানে নগদ আছে ১৫ কোটি ১ লাখ টাকা, যেখানে মাত্র দুই বছর আগে উপজেলা নির্বাচনের সময় তাঁর নগদ অর্থ ছিল মাত্র ২ লাখ টাকা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬ আসনে মোট ১৪৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ১৭ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। হলফনামার তথ্যমতে, বিএনপির ১৭ প্রার্থীর মধ্যে ৯ জনের এবং জামায়াতের ১৪ প্রার্থীর মধ্যে ২ জনের হাতে কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ রয়েছে।
জসীম উদ্দিনের বিস্ময়কর উত্থান
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমেদ আয়ের উৎস হিসেবে দেশীয় ব্যবসার পাশাপাশি বৈদেশিক আয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনিই একমাত্র প্রার্থী যার আয়ের উৎসে বিদেশ থেকে আসা অর্থের উল্লেখ রয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি দেখিয়েছিলেন, তাঁর হাতে নগদ আছে মাত্র ২ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানার কাছে ছিল সাড়ে ৪ হাজার টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে সেই জসীমের হাতে এখন ১৫ কোটি টাকা। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে ব্যবসায় যুক্ত এবং তাঁর হাতেও রয়েছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
কোটিপতিদের তালিকা ও পারিবারিক সম্পদ
বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। গত সরকারের আমলে টানা ৮ বছর কারাগারে থাকলেও তাঁর নগদ অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জাহাজভাঙা শিল্পের এই ব্যবসায়ীর মোট সম্পদের পরিমাণ ৪৫৬ কোটি টাকা। তাঁর স্ত্রী জামিলা নাজনীন মাওলার হাতে রয়েছে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং মেয়ের নামে রয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
প্রথমবারের মতো নির্বাচনে আসা বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০) রয়েছেন তৃতীয় অবস্থানে। পেশায় ব্যবসায়ী এই প্রার্থীর হাতে নগদ আছে ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর হাতে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের হাতে নগদ রয়েছে ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
স্ত্রীর সম্পদে চমক
নিজে কোটি টাকার মালিক না হলেও স্ত্রীর বিপুল নগদ অর্থের কারণে আলোচনায় রয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তাঁর নিজের হাতে কোটি টাকা না থাকলেও তাঁর ব্যবসায়ী স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামা খানের হাতে রয়েছে ২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহের ক্ষেত্রেও। তাঁর নিজের হাতে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা থাকলেও স্ত্রী সাদিয়া এরশাদের হাতে রয়েছে ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর হাতে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা থাকলেও তাঁর স্ত্রী মিনা পারভীন কাদের চৌধুরীর হাতে রয়েছে ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১১) দেখিয়েছেন ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম-১২ আসনের এনামুল হকের হাতে রয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং চট্টগ্রাম-৬ আসনের গোলাম আকবর খন্দকারের হাতে আছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা।
বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম নগদ অর্থ চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সরওয়ার আলমগীরের, যার পরিমাণ ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা।
জামায়াতের চিত্র
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থে সবার ওপরে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম। নগদ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং ব্যাংকে জমা মিলিয়ে তাঁর অর্থের পরিমাণ ৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রীর হাতে রয়েছে ১৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরীর হাতে রয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রীর কাছে আছে প্রায় ২৯ লাখ টাকা।
জামায়াতের অন্য প্রার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ আসনের এ কে এম ফজলুল হকের চেয়ে তাঁর স্ত্রীর নগদ অর্থ বেশি। ফজলুল হকের ১৭ লাখ টাকার বিপরীতে তাঁর স্ত্রীর হাতে রয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। দলটির প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম নগদ অর্থ চট্টগ্রাম-৩ আসনের আলা উদ্দিন সিকদারের, যার পরিমাণ মাত্র ৭৭ হাজার ৬২৯ টাকা।