সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ দাবিতে দেশজুড়ে উত্তাল ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফুঁসছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের দাবিতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বঙ্গভবনের সামনে মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) রাতে ঘটে যাওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতি আন্দোলনের এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে, যখন বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবনের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন।

বিক্ষোভের সূচনা ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজমায়েত

মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিশাল গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রপতির অপসারণ, সংবিধান বাতিলসহ পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে। শিক্ষার্থীরা সরকারের প্রতি এ দাবিগুলো পূরণ করতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়। সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বঙ্গভবনের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে অবস্থান গ্রহণ করেন। মিছিলকারীরা দাবি করেন, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ছাড়া তাদের আন্দোলন থামানো সম্ভব নয়।

বঙ্গভবনের সামনে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ

সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আশ্বাসে বিক্ষোভ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাতে ছাত্র-জনতার একটি অংশ নতুন করে বঙ্গভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তারা মাইকে বঙ্গভবনে ঢোকার ঘোষণা দেন এবং কিছু সময় পর ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। উত্তেজিত জনতা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে মিছিল করে এবং পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে বঙ্গভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে।

বিক্ষোভের সময় শ্যামপুর বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহম্মেদ বিশাল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী আরিফ খান, সাংবাদিক রাজু আহমেদসহ আরও কয়েকজন আহত হন। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায় এবং গাড়িটি বিকল হয়ে যায়। এরপর আন্দোলনকারী কিছু যুবক পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে এবং গাড়িটি ঠেলে থানার দিকে নিয়ে আসে। তবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে থাকে।

সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

বঙ্গভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও সেনাসদস্যদের মোতায়েন করা হয়। উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। রাতে যখন বিক্ষোভ চরমে পৌঁছায়, তখন সেনাসদস্যরা আবার ব্যারিকেড পুনঃস্থাপন করেন এবং বঙ্গভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন ঘোষণা

রাত সাড়ে ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং রিফাত রশিদ বঙ্গভবনের সামনে এসে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানান। তারা ঘোষণা দেন, আগামী দুই দিনের (বুধ ও বৃহস্পতিবার) মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতির নাম প্রস্তাব করা হবে এবং এর পরবর্তীতে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের আগে যদি আন্দোলনকারীদের কোনো দাবি মানা না হয়, তাহলে তারা আবারও রাস্তায় নামবে।

রাষ্ট্রপতিকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি থেকে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ না করলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ‘রক্তিম জুলাই ২৪’, ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা কমিটি’, ‘ইনকিলাব মঞ্চ’সহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বঙ্গভবন-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।

সাংবিধানিক আলোচনার প্রেক্ষাপট

মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগসহ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সাংবিধানিক করণীয় বিষয়ে আলোচনা শেষে প্রধান বিচারপতি আইজিপি, র‍্যাব ডিজি এবং ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। তবে বৈঠকের সুনির্দিষ্ট আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা হয়েছে।

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামে লাঠি মিছিল এবং বরিশালে মশাল মিছিলের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

রাষ্ট্রপতির অপসারণ নিয়ে সরকারের অবস্থান

রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব জানিয়েছেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার একমত হলেও, রাষ্ট্রপতিকে সরানোর প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবি

বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশ পরিচালনা করছে। ইনকিলাব মঞ্চসহ কয়েকটি সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ

রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের যে ঢেউ উঠেছে, তাতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাসদস্যদের সক্রিয়তা সত্ত্বেও বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি কেমন মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে সরকারের করণীয় এবং আন্দোলনকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

পাঠকপ্রিয়