সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কুমিল্লার ছন্দু হোটেল কেন মহাসড়কের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হোটেল?

সায়িমা সাফা

রাত তিনটা বাজে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাকের গর্জন শুনে অনেকের ঘুম ভাঙতে পারে। কিন্তু এই গভীর রাতেও পদুয়ার বাজারের ছন্দু হোটেলে জমজমাট পরিবেশ। ট্রাক চালক আবদুর রহিম আর তাঁর সহকারী সেলিম ক্লান্ত শরীরে এই খাবার দোকানে বসে খেতে শুরু করেছেন। সামনে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, গরুর মাংস, আর আলু ভর্তা, সঙ্গে আছে সরিষার তেল দিয়ে মাখানো সালাদ। খাবারের ঘ্রাণে যেমন তাদের পেট মজে, তেমনি মনের ক্লান্তিও যেন মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়।

“৩০ বছর ধরে এই রুটে ট্রাক চালাই। একদম প্রথম থেকেই এই ছন্দু হোটেলে থামি। এখানে খেয়ে আবার শক্তি নিয়ে রওনা দিই,” বলছিলেন আবদুর রহিম। তাঁর কথার মধ্যে যে শান্তি আর আস্থা, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ছন্দু হোটেলের খাবার আর সেবার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কত গভীর। এমন অনেক পথিকেরই প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে এই হোটেল।

ছন্দু হোটেলের জন্ম এবং পথচলার শুরু

১৯৮৪ সালে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে শুরু হয় ছন্দু হোটেলের যাত্রা। এর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ছন্দু মিয়া। প্রথমে শহরের ভেতর ইকবাল হোটেল নামে একটি ছোট রেস্টুরেন্ট চালাতেন ছন্দু মিয়া। ১৯৮৪ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে খাবারের দোকান খুলবেন। শুরুতে হোটেলের ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না, কারণ তখন মহাসড়কের নির্মাণকাজ চলছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সালে মহাসড়কের কাজ শেষ হলে ছন্দু হোটেলের জমজমাট সময় শুরু হয়।

প্রথমদিকে তিনটি টেবিল ছিল, যেখানে ছয়জন করে মোট ১৮ জন বসতে পারতেন। মেনুতে ছিল গরুর মাংস, আলু ভর্তা, ডাল আর ভাত। মাত্র ৭ টাকায় পাওয়া যেত এই খাবার প্যাকেজ। ধীরে ধীরে দাম বাড়লেও এই খাবারের প্যাকেজ আজো মানুষের জন্য প্রিয়। বর্তমানে ১৮০ টাকায় পাওয়া যায় গরুর হাফ প্লেট মাংস, কিন্তু সেই পুরোনো স্বাদে এখনও তৃপ্তি মেলে।

ছন্দু হোটেল: যে রেস্তোরাঁ হয়ে উঠেছে একটি ব্র্যান্ড

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রথম খাবারের দোকান হিসেবে খ্যাত এই ছন্দু হোটেল। এর পরপরই এই রুটে আসতে থাকে আরও অনেক রেস্টুরেন্ট, যেমন- হাইওয়ে ইন, বিরতি রেস্টুরেন্ট। কিন্তু এত প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও ছন্দু হোটেলের খ্যাতি একটুও কমেনি। মূলত গরুর মাংস আর আলু ভর্তার অসাধারণ স্বাদ ও কম দামে খাবার সরবরাহের কারণেই ছন্দু হোটেল আজ এত জনপ্রিয়।

বর্তমানে ছন্দু হোটেলটির পরিচালনা করছেন ছন্দু মিয়ার ছেলে তোফায়েল আহমেদ। তাঁর মতে, “আমার বাবার নাম একটা ব্র্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু নাম নয়, আমাদের খাবারের স্বাদই এই জনপ্রিয়তার পেছনে মূল কারণ। আমরা সবসময় খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম ঠিক করি, যেন সাধারণ মানুষ আমাদের কাছে আসতে পারে। অন্যান্য হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের তুলনায় আমাদের খাবারের দাম কম।”

স্বাদের রহস্য: গরুর মাংসের বিশেষ রেসিপি

প্রতিদিন ছন্দু হোটেলে রান্না হয় প্রায় ৬০ কেজি গরুর মাংস। এই মাংস রান্নার বিশেষ কিছু পদ্ধতি রয়েছে, যা ছন্দু মিয়ার আমল থেকে চলে আসছে। তোফায়েল জানান, “রান্নায় ব্যবহৃত সব মসলা আমরা নিজেরাই তৈরি করি। রান্নার জন্য আলাদা কিছু গোপন মসলাও ব্যবহার করা হয়, যার ফলে মাংসের স্বাদ আলাদা হয়ে ওঠে। প্রতি মণ মাংসে আট কেজি করে পেঁয়াজ ব্যবহার করি। এছাড়া টক দই, পোস্ত বাটা, বাদাম বাটাসহ নানা মসলায় মাংস রান্না করি।”

কুমিল্লার ছন্দু হোটেলে গরুর মাংস

এত পরিশ্রমের পরেও রান্নায় একটুও পানি ব্যবহার করা হয় না। মাংস থেকে বের হওয়া পানিতেই সব রান্না হয়। শেষে তেলের গাঢ় ভাব নিয়ে তৈরি হয় গরুর মাংসের বিখ্যাত তেল বাগাড়। এইভাবে যত্ন নিয়ে রান্না করা গরুর মাংস যে কোনো একবার খেলে মনে হতে বাধ্য, এই স্বাদ আর কোথাও নেই।

পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশেষ উদ্যোগ: সব কিছু চোখের সামনে

ছন্দু হোটেলের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সব সময়ই জোর দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর থেকে একবার জরিমানা করা হলেও, তা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ আছে। তোফায়েল বলেন, “আমাদের রেসিপিতে টক দই থাকে, যা আমরা নিজেরাই তৈরি করি। সেই দইয়ে উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ দেওয়া থাকে না। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সেটাকে নিয়েই প্রশ্ন তুলে। তবুও আমরা পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সবসময় গুরুত্ব দিয়ে দেখি।”

এই রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর খোলা থাকে সবার জন্য। কেউ চাইলে রান্নার স্থান দেখে আসতে পারে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টাইলসের মেঝে, পেঁয়াজ কাটা মেশিনের ব্যবহার এসবই পরিচ্ছন্নতার প্রমাণ দেয়। এছাড়াও প্রতিদিন রান্নায় ১৫-২০ কেজি পেঁয়াজ ব্যবহৃত হয়, যা নিজস্ব মেশিনে কাটা হয়।

বৃহৎ পরিসরে রেস্টুরেন্ট—পাঁচটি শাখা

আজকের দিনে ছন্দু হোটেলের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে কেবল পদুয়ার বাজারেই নয়, আরও চারটি শাখায় ছড়িয়ে পড়েছে। টমসম ব্রিজ, ক্যান্টনমেন্ট, লাকসাম রোড এবং চট্টগ্রাম রোডে ছন্দু হোটেলের শাখাগুলো রয়েছে। চট্টগ্রাম রোডের শাখাটির নাম রাখা হয়েছে “বিন রাজ্জাক হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট,” যা ছন্দু মিয়ার আসল নাম আব্দুর রাজ্জাক থেকে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, কিছু শাখায় তোফায়েল আহমেদ পার্টনার নিয়েছেন, তবে তিনি সব শাখায়ই নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখেন। তাঁর লক্ষ্য হলো, ছন্দু হোটেলের গুণগত মান ধরে রাখা। যেখানে প্রতিটি খাবারের মান যেন ছন্দুর পরিচিত স্বাদ ধরে রাখতে পারে।

 

কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বিপরীতে ছন্দুর সাধ্যের মধ্যে খাবার

হাইওয়ে রেস্টুরেন্টগুলো বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন বাস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। এতে করে নির্দিষ্ট কিছু বাস নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে থামে, ফলে যাত্রীরা সেখানেই খেতে বাধ্য হন। এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে এসব রেস্টুরেন্ট খাবারের মূল্যও দ্বিগুণ করে রাখে। একটি সাধারণ প্লেট ভাতের দাম যেখানে অন্য জায়গায় ১০-২০ টাকা, সেখানে হাইওয়ের রেস্টুরেন্টে তা ৫০-৬০ টাকা।

ছন্দু হোটেল কখনোই বাস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে যায়নি। তাদের জনপ্রিয়তা মূলত স্বাদ ও সেবার কারণে। যারা একবার খেতে আসে, তারা বারবার ফিরে আসে। তোফায়েল বলেন, “আমাদের বাবা এই ব্যবসা আমাদের দিয়ে গেছেন। তিনি সবসময় বলেছেন যেন দাম সাধ্যের মধ্যে থাকে। আমরা আমাদের ক্রেতাদের কাছে এই মনোভাব নিয়েই সেবা দিই। লোকাল মানুষও এখানে নিয়মিত খেতে আসেন।”

‘রোল মডেল’ হতে চায় ছন্দু হোটেল

ছন্দু হোটেলের নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনা নেই। তবে বর্তমানে পাঁচটি শাখাকে আরও উন্নত ও আধুনিক করতে চান তাঁরা। যেন বাংলাদেশের হাইওয়ে রেস্টুরেন্টগুলো তাদের মতো যাত্রীদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। হাইওয়ের সকল রেস্টুরেন্টের জন্য রোল মডেল হতে চায় ছন্দু হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।

তাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সেবা করা। ছন্দু হোটেল সবার কাছে একটি ব্র্যান্ড, একটি আস্থা এবং একটি সুখস্মৃতির নাম হয়ে থাকবে—এই স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন তাঁরা কাজ করে চলেছেন।

 

পাঠকপ্রিয়