দস্তগীর হোটেল—চট্টগ্রামের ভোজনরসিকদের কাছে একটি বিশেষ নাম। ভোরের আলো ফোটার আগেই আন্দরকিল্লার মোমিন রোডের এই বিখ্যাত হোটেলের সামনে মানুষের ভিড় জমে ওঠে। দস্তগীর হোটেলের প্রধান আকর্ষণ নলা-নেহারি, একটি ঐতিহ্যবাহী পদ যা একবার খেলে ভোলার নয়। বহু বছর ধরে এই হোটেলের রান্নায় উঠে আসে চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর খাবারের প্রতি মানুষের গভীর আবেগ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই স্বাদ পেতে, যেন দস্তগীরের নলা-নেহারি শুধু খাবার নয়, বরং ভোরবেলার একটি অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
নলা-নেহারির গল্প: দস্তগীর হোটেলের ঐতিহ্য
দস্তগীর হোটেল চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার কদম মুবারক মসজিদের বিপরীতে মোমিন রোডে অবস্থিত। এ হোটেলের প্রধান আকর্ষণ হলো নলা-নেহারি। এ পদটি একসময় পাকিস্তানি বিহারী বাবুর্চির হাতে তৈরি হয়েছিল, এবং সেই সময় থেকেই নলা-নেহারি চট্টগ্রাম শহরের একটি বিশেষ রেসিপি হিসেবে বিবেচিত। বাবুর্চির হাত বদল হলেও সেই সময়কার রেসিপি এবং স্বাদের প্রতি আনুগত্য রেখে এখনও এই পদটি তৈরি করা হয়।
নুরুল আলম, যিনি বর্তমান দস্তগীর হোটেলের মালিক, গত ১২ বছর ধরে নিজের হাতে এই হোটেল পরিচালনা করছেন। তিনি জানালেন, হোটেলের বাবুর্চি বর্তমানে প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পদটি রান্না করে আসছেন। “আমাদের বর্তমান বাবুর্চি সেই বিহারী বাবুর্চির সহকারী ছিলেন এবং তাঁর কাছেই সবকিছু শিখেছেন। পুরোনো সেই স্বাদ এখনও একই রকম আছে,” বললেন নুরুল আলম।

দস্তগীরের নলা-নেহারির চাহিদা এবং খ্যাতি
চট্টগ্রামের মানুষ এবং অন্যান্য এলাকার পর্যটকরা একবার হলেও এই হোটেলে আসার জন্য মুখিয়ে থাকেন। বিশেষত শীতের সকালে গরম নলা-নেহারির স্বাদ গ্রহণের মজাই আলাদা। কথাচ্ছলে হোটেল মালিক নুরুল আলম জানালেন, নলা-নেহারির জন্য প্রতিদিন ফজরের আজানের আগেই গ্রাহকের ভিড় লেগে যায়। রাত ৪টা থেকে শুরু করে হোটেলের কর্মীরা সারি সাজিয়ে নেহারি পরিবেশন করেন, যেন এক মুহূর্তও বিলম্ব না হয়।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এবং এমনকি বিদেশ থেকেও অনেকে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে। কানাডিয়ান ফুড ব্লগার ট্রেভর জেমস যিনি ‘দ্য ফুড রেঞ্জার’ নামক একটি বিখ্যাত ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করেন, একবার এসেছিলেন দস্তগীর হোটেলে এবং নলা-নেহারির অসাধারণ স্বাদের প্রশংসা করেছেন তাঁর ব্লগে। এই কারণে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যেও দস্তগীরের নাম বেশ পরিচিত।
ভোরবেলার অভিজ্ঞতা: নলা-নেহারির সন্ধানে
আমি নিজেও ভোরের শীতল আবহে নলা-নেহারির স্বাদ নিতে ছুটে গিয়েছিলাম দস্তগীর হোটেলে। তখন ভোর ৫টা ২০ মিনিট। রাস্তায় নেই তেমন মানুষের আনাগোনা, নেই কোনো গাড়ির শব্দ। সবার আগে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে হেঁটেই এগোচ্ছিলাম। ভাগ্যক্রমে কিছু সময় পরে এক মোটর রিকশা পেয়েছিলাম এবং মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যাই আন্দরকিল্লার কদম মুবারকের পাশে দস্তগীর হোটেলের সামনে।
এই ভোরবেলাতেও হোটেলের সামনে দেখা মেলে এক বিশাল ভিড়ের। এর মধ্যে, বেশিরভাগ মানুষই দাঁড়িয়ে আছেন অপেক্ষায়, কারও খাওয়া শেষ হলে টেবিল পেলে তবেই বসতে পারবেন। এত ভোরেও হোটেলের ভেতরে এত ভিড় ছিল যে ভিতরে দাঁড়িয়ে খাবার অপেক্ষা করতেও কষ্ট হচ্ছিল। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই নলা-নেহারির অমল স্বাদ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

ঐতিহ্যবাহী রান্না এবং পরিবেশন
দস্তগীর হোটেলের এই খাবার তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। নলা-নেহারি তৈরির জন্য রাতভর রান্না চলে। দারুণ স্বাদে উপভোগ্য এই রান্নাটি বানানোর সময় স্বাদ এবং মান ধরে রাখার জন্য বিশেষ ধরণের মসলার ব্যবহার করা হয়। ৪৫ জন কর্মীর মধ্যে একজন বিশেষ বাবুর্চি একমাত্র নলা-নেহারি রান্নার দায়িত্বে আছেন। বাকিরা রুটি বানানো এবং অন্যান্য রান্নার কাজে নিযুক্ত।
“আমরা প্রতিদিন সাড়ে চারটা-পাঁচটা থেকে খাবার দেওয়া শুরু করি। তবে শুক্রবারে একটু আগেই শুরু হয়,” জানালেন নুরুল আলম। এছাড়া সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে, যেমন বৃহস্পতিবার ও রবিবার, মেজবানের আয়োজনও থাকে। সেসব দিন দুপুর এবং রাতের বেলাতেও প্রচুর মানুষের আনাগোনা দেখা যায়।
খাবারের চাহিদা এবং প্রতিযোগিতা
নলা-নেহারির চাহিদা এতটাই বেশি যে অনেকেই না খেয়েই ফিরে যান, কারণ শেষ হয়ে যায় খাবার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন জানালেন, তিনি এবং তার বন্ধুরা প্রায়ই এখানে আসেন নেহারির স্বাদ নিতে। “শীতকালে আসতেই হয় এখানে, তবে দেরি হলে খাবার শেষ হয়ে যায়,” বললেন তিনি।
এছাড়া, ভোজনরসিকদের জন্য দস্তগীরের মেন্যুতে রয়েছে আরও কিছু জনপ্রিয় খাবার। গরুর বটের দাম মাত্র ১২০ টাকা, গরম রুটি আর চিংড়ি ভুনা কিংবা গরুর মাংস ভুনা খেতে চাইলে গুনতে হবে ১২০ টাকা। এছাড়া মাত্র ৮০ টাকায় পাওয়া যায় চিকেন স্যুপ। তবে গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় এত খাবার পরিবেশন করাও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

লাভের চিন্তা নয়, ঐতিহ্য ধরে রাখাই লক্ষ্য
দস্তগীর হোটেল বহু পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। হোটেলের মাসিক লাভের পরিমাণ প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা। নুরুল আলম বলেন, “জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে টিকে থাকাটাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তাই লাভের জন্য নয়, বরং প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই এখনও দস্তগীর হোটেল চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
আবেগ ও স্মৃতির জায়গা
দস্তগীর হোটেল শুধু একটি খাবারের দোকান নয়, বরং এটি চট্টগ্রামের বহু মানুষদের স্মৃতি ও আবেগের জায়গা। ষাটোর্ধ্ব মো. সাত্তার জানান, “আমার ছেলেবেলায় বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত আসতাম। আজো মাঝে মাঝে স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসি। এই ঐতিহ্যের প্রতি টান থেকেই হয়তো বারবার আসি।”
সুতরাং, দস্তগীর হোটেলের এই প্রাচীন স্বাদ ও ঐতিহ্যই চট্টগ্রামের মানুষ এবং পর্যটকদের এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের খাবারে গুণগত মান এবং মজাদার স্বাদের প্রতি যে নিষ্ঠা, সেটিই দস্তগীরের ঐতিহ্যকে আজও সমানভাবে সমাদৃত করে রেখেছে।