বাংলাদেশ ব্যাংকের পদত্যাগী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বাণিজ্যিক ব্যাংক লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন, প্রচলিত নীতিমালা শিথিল করার মাধ্যমে। তার নীতিমালা এমনভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছিল যাতে লুটপাটকারীরা বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন। এর ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অযৌক্তিকভাবে ঋণ পেতে সক্ষম হয় এবং ডলার না পেলেও ছাপানো টাকার জোগান দেওয়া হয়। এই অনিয়ন্ত্রিত টাকা ছাপা সরকারকে ঋণ দেয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। আরও একটি ব্যাংককে দখলদারের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং সুদের হার ও ডলারের দাম নির্ধারণে ঘনঘন নীতির পরিবর্তন অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে।
রউফের নীতি: ব্যাংক লুটপাটের দরজা খুলে দেওয়া
নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের নীতিমালা শিথিল করার ফলে ব্যাংকগুলোতে লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অযৌক্তিকভাবে ঋণ পেয়েছে এবং ছাপানো টাকার মাধ্যমে সরকারকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ডলার না পেলেও ছাপানো টাকার জোগান দেওয়া হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়াও, একটি ব্যাংককে দখলদারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সুদের হার ও ডলারের দাম নির্ধারণে ঘনঘন নীতি পরিবর্তন অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে।
একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং ব্যাংক খাতের অভিভাবকের এমন কর্মকাণ্ডে খাতসংশ্লিষ্টরা হতবাক হয়েছেন। ব্যাংক লুটের প্রতি গভর্নরের নৈতিক, পলিসিগত এবং প্রত্যক্ষ সমর্থন খাতের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আব্দুর রউফ তালুকদার যখন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ব্যাংক খাতে লুটপাটের সুযোগ বাড়ে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ.হ. ম. মুস্তফা কামালের নির্দেশে আব্দুর রউফ তালুকদার এস আলম গ্রুপকে নীতিবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং অর্থ বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন।
২০২২ সালের ১২ জুলাই গভর্নর হিসেবে নিয়োগের পর মাত্র ৬ দিনের মধ্যে আব্দুর রউফ তালুকদার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষমতা দিয়ে দেন। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেআইনীভাবে পুনঃতফশিল করা শুরু হয়। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালার সুযোগ দেওয়া হয়, যা অর্থ বিদেশে পাচারের কারণ হয়।
২০২২ সালের ১৮ জুলাই সার্কুলার জারির আগে খেলাপি ঋণ নবায়ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে হত। কিন্তু সার্কুলার জারির পর খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিলের ক্ষমতা বাণিজ্যিক ব্যাংকের পর্ষদের হাতে চলে যায়, যা ব্যাংকগুলিকে নিয়মিত নীতিমালা ভঙ্গ করে ঋণ নবায়ন করার সুযোগ করে দেয়। ফলে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রভাবশালী গ্রাহকরা সুবিধা পায়।
গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে সুদের হার নির্ধারণে ঘনঘন নীতি পরিবর্তন অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্মার্ট রেট চালু করা হয়, যা সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। ২০২৪ সালের ৮ মে স্মার্ট রেট প্রত্যাহার করে বাজারভিত্তিক ঋণের সুদহার চালু করা হয়, তবে বাড়তি সুদ অব্যাহত থাকে। ডলারের দাম নির্ধারণে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু করে ডলারের দাম স্থিতিশীল করা হয়, যা বাজারকে অস্থির করে তোলে।
২০২৩ সালের ৫ মে ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গভর্নরের ইচ্ছায় ব্যাংকটি ওই গ্রুপের হাতে দেওয়া হয়, কারণ ব্যাংকটি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে চাচ্ছিল না। ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে বেপরোয়া ঋণ দেওয়া হয়, যেমন জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় থেকে বেক্সিমকো গ্রুপকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন ঘটনা।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়ে সরকার নজিরবিহীনভাবে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা ৩১ জুলাই এর স্থিতিতে বেড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা হয়। আলোচ্য সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৯৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়। ছাপানো টাকায় ঋণ দেওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পায়।
আব্দুর রউফ তালুকদারের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি, যদিও ব্যাংক দখল ও লুটপাটে তার সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের সাবেক এমডি এসএম ফরমানুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করার দায়ে মামলাটি করা হয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রকল্পে বেআইনিভাবে মোটা অঙ্কের ঋণ না দেওয়ার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, এবং মামলাটি এখন পুলিশ তদন্ত করছে।