সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের পেছনে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জনগণের আন্দোলনে সরকারের পতনের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

কিন্তু সম্প্রতি নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈঠকের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমিরাতের এই কোম্পানির প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেছেন এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে আগ্রহী ছিল, যদিও স্থানীয় অপারেটররা এর বিরোধিতা করে আসছিল।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখে স্থানীয় অপারেটররা নতুন করে মুখ খুলেছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হয়েছিল, যা তার ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করে।

নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের গুরুত্ব কোথায়?

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বাংলাদেশের কন্টেইনার পণ্য উঠানামার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে দেশের মোট কন্টেইনার পণ্যের ৫৫ শতাংশ উঠানামা করা হয়।

এটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল এবং এখান থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করে।

দ্রুত পণ্য উঠানামা, শ্রমিক অসন্তোষমুক্ত পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এনসিটি ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মোট পাঁচটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি বর্তমানে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পণ্য উঠানামা করছে।

২০০৭ সালের আগে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজগুলোকে জেটিতে ভেড়ার আগে বহির্নোঙ্গরে ১২ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হতো। এছাড়াও, ধর্মঘটের কারণে বন্দরে প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হতো, যার ফলে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হতো এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেত।

আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে বর্তমানে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে ২ থেকে আড়াই দিনে নেমে এসেছে, যা পণ্য পরিবহনের খরচ কমিয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এনসিটির কার্যকর ব্যবস্থাপনার ফলে জাহাজ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য উঠানামা সেরে বন্দর ছেড়ে যেতে পারে। এই দ্রুত সেবা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক স্থান দখল করতে সাহায্য করেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বের শীর্ষ বন্দরের তালিকায় ৬১তম স্থানে উন্নীত করেছে।

এভাবে এনসিটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

চট্টগ্রাম বন্দর : এনসিটি এখন পরিচালনা করছে কারা?

চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময় নির্মিত হলেও, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে সে বিষয়ে জটিলতা দেখা দেয়। বিএনপি সরকার, পরবর্তীতে সেনা-সমর্থিত সরকার এবং তারপর আওয়ামী লীগ সরকারও বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রতিবাদের কারণে তা সফল হয়নি।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সংস্কার সাধন করে এবং সাইফ পাওয়ারটেক নামক একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।

সাইফ পাওয়ারটেক বিদেশি বন্দরে কর্মরত দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ করে এনসিটি পরিচালনা শুরু করে। নিজস্ব কর্মীরা দক্ষ হয়ে ওঠার পর বিদেশি কর্মীরা চলে যায়। এরপর থেকে সাইফ পাওয়ারটেক দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আসছে।

২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাইফ পাওয়ারটেক এককভাবে এনসিটি পরিচালনা করে। ২০১৫ সালের জুন মাসে দুটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনায় অংশীদার হয়।

এই দুটি প্রতিষ্ঠান হলো – চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের মালিকানাধীন এমএইচ চৌধুরী লিমিটেড এবং নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিমের মালিকানাধীন এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স।

এই দুটি প্রতিষ্ঠান এর আগে থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এর দুটি জেটি পরিচালনা করে আসছিল। ২০১৫ সালে এই দুটি প্রতিষ্ঠান এনসিটির দরপত্রে অংশগ্রহণ করলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে সাইফ পাওয়ারটেক এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কো-পার্টনার হিসেবে অংশীদার করে নেয়।

ডিপি ওয়ার্ল্ড কোন যুক্তিতে, নেপথ্যে কি সালমান?

পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে এনসিটি বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কার্যক্রম যথেষ্ট এগিয়েও ছিল। এ লক্ষ্যে সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগ করেছিল।

অনেক বন্দর ব্যবহারকারী এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবের কারণে সেই প্রতিবাদ কার্যকর হয়নি। ফলে, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দিয়ে এনসিটি পরিচালনার প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে থাকে।

বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার পক্ষে যুক্তি ছিল যে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পণ্য ওঠানামার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়বে, চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উন্নত হবে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এনসিটি বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার উদ্যোগে ব্যাঘাত ঘটে।

এই অবস্থায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের সাথে গত ২৯ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের সাথে সাক্ষাৎ করলে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

জানা গেছে, আরব আমিরাতের প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতে তারা এনসিটি এবং বে টার্মিনালে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে এই প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম সফর করে বন্দর পরিদর্শন করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করে। এনসিটি এবং বে টার্মিনাল পরিচালনায় তাদের আগ্রহের কথা পুনরায় জানায়।

এই পরিস্থিতিতে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন অভিযোগ করেছেন যে, সরকার এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি বরং নতুন কৌশলে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “পূর্বে সালমান এফ রহমান জোর করে এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন। এখন অন্যরা একই কাজ করার চেষ্টা করছে।

“বিগত সরকারের আমলে সালমান এফ রহমান এমনভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন যে, মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়েছিল বিদেশিদের হাতে এনসিটি তুলে দিতে। তার কমিশন বাণিজ্য ছাড়াও বিদেশি অপারেটর পণ্য ওঠানামার আয়ের ১০-২০ শতাংশ দেশে রেখে বাকি টাকা বিদেশে নিয়ে যেত।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কমিশন পাওয়ার উদ্দেশ্যেই বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করলে সমস্ত আয় দেশেই থাকবে।

বিরোধিতার পক্ষে কী যুক্তি?

স্থানীয় অপারেটররা বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল বিদেশিদের দ্বারা পরিচালিত হলে বন্দরের রাজস্ব আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও, দেশের ৫৫ শতাংশ কন্টেইনার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণকারী এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

তারা বলছে, বর্তমানে এনসিটি সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আছে। বিদেশি অপারেটর আসলে এই নিয়ন্ত্রণ আর থাকবে না, যার ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৫ শতাংশ কন্টেইনার ওঠানামার জন্য বিকল্প কোনও টার্মিনাল নেই।

এছাড়াও, বিদেশি অপারেটর এলে এনসিটিতে পণ্য ওঠানামার খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে তারা মনে করে। পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর ফলে ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

তারা আরও যুক্তি দেখায় যে, বিদেশি অপারেটর পণ্য ওঠানামা পরিচালনার আয়ের একটা বড় অংশ বিদেশে নিয়ে যাবে। ফলে রাজস্ব আয়ের একটা অংশ হাতছাড়া হবে।

দেশের বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে দেশের টার্মিনাল পরিচালনার বিরোধিতা তারা করেন না। তবে এনসিটি একটি সম্পূর্ণ কার্যকর টার্মিনাল, যেখানে বন্দরের হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়েছে। এই টার্মিনালটি শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নয়, সমগ্র দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০০৯ সাল থেকে এই টার্মিনালটি ধর্মঘটমুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখতে অসাধারণ অবদান রাখছে। তাই এই সচল টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনা করার কোন যৌক্তিকতা তারা দেখছেন না।

তাদের মতে, নতুন কোন স্থানে আধুনিক টার্মিনাল তৈরি করে আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য অপারেটরদের দিয়ে তা পরিচালনা করা যেতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে চার গুণ বড় প্রস্তাবিত ‘বে টার্মিনাল’, ‘মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর’ অথবা ‘পায়রা সমুদ্রবন্দরে’ নতুন টার্মিনাল নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। এতে বিশ্বের সব আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তারা টার্মিনাল পরিচালনা করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। এভাবে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থ ও যন্ত্রপাতি দিয়ে গড়ে ওঠা এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার কোন যুক্তি নেই। তাই এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

২০০৭ সালে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, সেই সময় এনসিটি বেসরকারি খাতে না দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের এতদিনের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হতো না।

এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যদি দেশীয় অপারেটর ভালোভাবে পরিচালনা করতে না পারত, তাহলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারত।”

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গেলেও, সম্প্রতি নৌপরিবহন উপদেষ্টার সাথে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, “হ্যাঁ, গত সপ্তাহে ডিপি ওয়ার্ল্ডের একটি প্রতিনিধি দল চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করেছে। তারা বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বন্দর পরিদর্শন করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল।”

বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। আমরা শুধুমাত্র ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগের বিষয়টি জানি।”

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড সদস্য জাফর আলম মনে করেন, এনসিটি দেশি না বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হবে সেটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। বর্তমানে যেভাবে দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে তার চেয়ে বিদেশি অপারেটর বেশি কার্যকর হবে কিনা তা বিচার করার জন্য জাতীয় স্বার্থ, প্রতিযোগিতা এবং দেশের অর্থনীতি সহ সকল দিক বিবেচনা করতে হবে।

“এজন্য একটি বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এই গবেষণা তাড়াহুড়ো করে অথবা যেকোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করলে হবে না। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে সময় নিয়ে এই গবেষণা করতে হবে। তারপর কোনটি দেশ ও দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো হবে তা বিবেচনা করতে হবে।”

জাফর আলম আরও বলেন, এনসিটি নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত ইমোশনালি নেওয়া উচিত নয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড যে প্রস্তাব দিয়েছে তার চেয়ে ভালো প্রস্তাব যদি পিএসএ সিঙ্গাপুর, এপিএম টার্মিনালস অথবা রেড সি দেয় তাহলে সেই প্রস্তাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত দক্ষ লোক প্রয়োজন। তাই আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। না হলে আমরা প্রতারিত হব।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ডিপি ওয়ার্ল্ডের চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের পেছনে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ অক্টোবর ২০২৪, ১৪:৩৮

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জনগণের আন্দোলনে সরকারের পতনের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

কিন্তু সম্প্রতি নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈঠকের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমিরাতের এই কোম্পানির প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেছেন এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে আগ্রহী ছিল, যদিও স্থানীয় অপারেটররা এর বিরোধিতা করে আসছিল।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখে স্থানীয় অপারেটররা নতুন করে মুখ খুলেছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হয়েছিল, যা তার ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করে।

নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের গুরুত্ব কোথায়?

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বাংলাদেশের কন্টেইনার পণ্য উঠানামার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে দেশের মোট কন্টেইনার পণ্যের ৫৫ শতাংশ উঠানামা করা হয়।

এটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল এবং এখান থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করে।

দ্রুত পণ্য উঠানামা, শ্রমিক অসন্তোষমুক্ত পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এনসিটি ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মোট পাঁচটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি বর্তমানে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পণ্য উঠানামা করছে।

২০০৭ সালের আগে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজগুলোকে জেটিতে ভেড়ার আগে বহির্নোঙ্গরে ১২ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হতো। এছাড়াও, ধর্মঘটের কারণে বন্দরে প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হতো, যার ফলে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হতো এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেত।

আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে বর্তমানে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে ২ থেকে আড়াই দিনে নেমে এসেছে, যা পণ্য পরিবহনের খরচ কমিয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এনসিটির কার্যকর ব্যবস্থাপনার ফলে জাহাজ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য উঠানামা সেরে বন্দর ছেড়ে যেতে পারে। এই দ্রুত সেবা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক স্থান দখল করতে সাহায্য করেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বের শীর্ষ বন্দরের তালিকায় ৬১তম স্থানে উন্নীত করেছে।

এভাবে এনসিটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

চট্টগ্রাম বন্দর : এনসিটি এখন পরিচালনা করছে কারা?

চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময় নির্মিত হলেও, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে সে বিষয়ে জটিলতা দেখা দেয়। বিএনপি সরকার, পরবর্তীতে সেনা-সমর্থিত সরকার এবং তারপর আওয়ামী লীগ সরকারও বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রতিবাদের কারণে তা সফল হয়নি।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সংস্কার সাধন করে এবং সাইফ পাওয়ারটেক নামক একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।

সাইফ পাওয়ারটেক বিদেশি বন্দরে কর্মরত দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ করে এনসিটি পরিচালনা শুরু করে। নিজস্ব কর্মীরা দক্ষ হয়ে ওঠার পর বিদেশি কর্মীরা চলে যায়। এরপর থেকে সাইফ পাওয়ারটেক দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আসছে।

২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাইফ পাওয়ারটেক এককভাবে এনসিটি পরিচালনা করে। ২০১৫ সালের জুন মাসে দুটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনায় অংশীদার হয়।

এই দুটি প্রতিষ্ঠান হলো – চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের মালিকানাধীন এমএইচ চৌধুরী লিমিটেড এবং নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিমের মালিকানাধীন এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স।

এই দুটি প্রতিষ্ঠান এর আগে থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এর দুটি জেটি পরিচালনা করে আসছিল। ২০১৫ সালে এই দুটি প্রতিষ্ঠান এনসিটির দরপত্রে অংশগ্রহণ করলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে সাইফ পাওয়ারটেক এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কো-পার্টনার হিসেবে অংশীদার করে নেয়।

ডিপি ওয়ার্ল্ড কোন যুক্তিতে, নেপথ্যে কি সালমান?

পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে এনসিটি বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কার্যক্রম যথেষ্ট এগিয়েও ছিল। এ লক্ষ্যে সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগ করেছিল।

অনেক বন্দর ব্যবহারকারী এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবের কারণে সেই প্রতিবাদ কার্যকর হয়নি। ফলে, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দিয়ে এনসিটি পরিচালনার প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে থাকে।

বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার পক্ষে যুক্তি ছিল যে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পণ্য ওঠানামার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়বে, চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উন্নত হবে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এনসিটি বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার উদ্যোগে ব্যাঘাত ঘটে।

এই অবস্থায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের সাথে গত ২৯ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের সাথে সাক্ষাৎ করলে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

জানা গেছে, আরব আমিরাতের প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতে তারা এনসিটি এবং বে টার্মিনালে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে এই প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম সফর করে বন্দর পরিদর্শন করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করে। এনসিটি এবং বে টার্মিনাল পরিচালনায় তাদের আগ্রহের কথা পুনরায় জানায়।

এই পরিস্থিতিতে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন অভিযোগ করেছেন যে, সরকার এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি বরং নতুন কৌশলে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “পূর্বে সালমান এফ রহমান জোর করে এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন। এখন অন্যরা একই কাজ করার চেষ্টা করছে।

“বিগত সরকারের আমলে সালমান এফ রহমান এমনভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন যে, মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়েছিল বিদেশিদের হাতে এনসিটি তুলে দিতে। তার কমিশন বাণিজ্য ছাড়াও বিদেশি অপারেটর পণ্য ওঠানামার আয়ের ১০-২০ শতাংশ দেশে রেখে বাকি টাকা বিদেশে নিয়ে যেত।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কমিশন পাওয়ার উদ্দেশ্যেই বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করলে সমস্ত আয় দেশেই থাকবে।

বিরোধিতার পক্ষে কী যুক্তি?

স্থানীয় অপারেটররা বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল বিদেশিদের দ্বারা পরিচালিত হলে বন্দরের রাজস্ব আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও, দেশের ৫৫ শতাংশ কন্টেইনার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণকারী এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

তারা বলছে, বর্তমানে এনসিটি সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আছে। বিদেশি অপারেটর আসলে এই নিয়ন্ত্রণ আর থাকবে না, যার ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৫ শতাংশ কন্টেইনার ওঠানামার জন্য বিকল্প কোনও টার্মিনাল নেই।

এছাড়াও, বিদেশি অপারেটর এলে এনসিটিতে পণ্য ওঠানামার খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে তারা মনে করে। পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর ফলে ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

তারা আরও যুক্তি দেখায় যে, বিদেশি অপারেটর পণ্য ওঠানামা পরিচালনার আয়ের একটা বড় অংশ বিদেশে নিয়ে যাবে। ফলে রাজস্ব আয়ের একটা অংশ হাতছাড়া হবে।

দেশের বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে দেশের টার্মিনাল পরিচালনার বিরোধিতা তারা করেন না। তবে এনসিটি একটি সম্পূর্ণ কার্যকর টার্মিনাল, যেখানে বন্দরের হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়েছে। এই টার্মিনালটি শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নয়, সমগ্র দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০০৯ সাল থেকে এই টার্মিনালটি ধর্মঘটমুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখতে অসাধারণ অবদান রাখছে। তাই এই সচল টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনা করার কোন যৌক্তিকতা তারা দেখছেন না।

তাদের মতে, নতুন কোন স্থানে আধুনিক টার্মিনাল তৈরি করে আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য অপারেটরদের দিয়ে তা পরিচালনা করা যেতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে চার গুণ বড় প্রস্তাবিত ‘বে টার্মিনাল’, ‘মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর’ অথবা ‘পায়রা সমুদ্রবন্দরে’ নতুন টার্মিনাল নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। এতে বিশ্বের সব আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তারা টার্মিনাল পরিচালনা করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। এভাবে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থ ও যন্ত্রপাতি দিয়ে গড়ে ওঠা এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার কোন যুক্তি নেই। তাই এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

২০০৭ সালে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, সেই সময় এনসিটি বেসরকারি খাতে না দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের এতদিনের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হতো না।

এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যদি দেশীয় অপারেটর ভালোভাবে পরিচালনা করতে না পারত, তাহলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারত।”

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গেলেও, সম্প্রতি নৌপরিবহন উপদেষ্টার সাথে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, “হ্যাঁ, গত সপ্তাহে ডিপি ওয়ার্ল্ডের একটি প্রতিনিধি দল চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করেছে। তারা বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বন্দর পরিদর্শন করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল।”

বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। আমরা শুধুমাত্র ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগের বিষয়টি জানি।”

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড সদস্য জাফর আলম মনে করেন, এনসিটি দেশি না বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হবে সেটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। বর্তমানে যেভাবে দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে তার চেয়ে বিদেশি অপারেটর বেশি কার্যকর হবে কিনা তা বিচার করার জন্য জাতীয় স্বার্থ, প্রতিযোগিতা এবং দেশের অর্থনীতি সহ সকল দিক বিবেচনা করতে হবে।

“এজন্য একটি বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এই গবেষণা তাড়াহুড়ো করে অথবা যেকোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করলে হবে না। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে সময় নিয়ে এই গবেষণা করতে হবে। তারপর কোনটি দেশ ও দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো হবে তা বিবেচনা করতে হবে।”

জাফর আলম আরও বলেন, এনসিটি নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত ইমোশনালি নেওয়া উচিত নয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড যে প্রস্তাব দিয়েছে তার চেয়ে ভালো প্রস্তাব যদি পিএসএ সিঙ্গাপুর, এপিএম টার্মিনালস অথবা রেড সি দেয় তাহলে সেই প্রস্তাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত দক্ষ লোক প্রয়োজন। তাই আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। না হলে আমরা প্রতারিত হব।