দেশ থেকে পাচার করা টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যে পাঁচটি কৌশল অবলম্বন করবে টাস্কফোর্স। এই কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে না আনা, আমদানি-রপ্তানিতে জালিয়াতি, হুন্ডি, এবং অন্যান্য অবৈধ পন্থায় অর্থ পাচার।
প্রথমে, টাস্কফোর্স বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং সেগুলি বিশ্লেষণ করে কারা, কীভাবে এবং কোথায় অর্থ পাচার করেছে তা শনাক্ত করবে। পাচার করা টাকার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এরপর, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে, ১৪ জন প্রাক্তন মন্ত্রী, ১৬ জন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিএফআইইউ থেকে এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের পর, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরও তদন্ত চালিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে এবং মামলা দায়ের করা হবে। মামলা পরিচালনার জন্য দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করা হবে এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সহায়তা নেওয়া হবে। আদালতে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, পাচার করা টাকা উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা হবে।
সম্প্রতি পুনর্গঠিত টাস্কফোর্স পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে এই টাস্কফোর্সের প্রথম বৈঠক বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। টাস্কফোর্সের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে কারা, কীভাবে এবং কোথায় টাকা পাচার করেছে, এবং সেই পাচার করা টাকা শনাক্ত ও উদ্ধারের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
প্রথমেই, পণ্য আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে পণ্য দেশে এসেছে কিনা তা যাচাই করা হবে। যদি কোনো আমদানিকারকের পণ্য দেশে না আসে এবং ব্যাংকের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দেয়, তাহলে তাকে অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
একইভাবে, রপ্তানির মূল্য যথাসময়ে দেশে না আনা বা ব্যাংকের কাছে যথাযথ ব্যাখ্যা না দেওয়া রপ্তানিকারকদের অর্থ পাচারের অভিযোগে চিহ্নিত করা হবে।
উচ্চ মূল্যে পণ্য আমদানি, এলসির চেয়ে কম পরিমাণে বা নিম্নমানের পণ্য আমদানি করে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে আমদানিকারককে অর্থ পাচারকারী বলে গণ্য করা হবে।
অন্যদিকে, রপ্তানি পণ্যের মূল্য কম দেখানো বা এলসির চেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিলে রপ্তানিকারককেও অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
এই তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা হবে। প্রয়োজনে, তথ্য যাচাইয়ের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিভিন্ন বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়া হবে।
প্রথম ধাপ হিসেবে, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হুন্ডি কারবারীদের শনাক্ত করা হবে। এরপর, হুন্ডি চক্রের মূল নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করে তাদের মাধ্যমে কারা, কোথায় টাকা পাচার করেছে সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এছাড়াও, ক্রেডিট কার্ড, বিদেশ ভ্রমণ, স্বর্ণ বা হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের শনাক্ত করা হবে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের নিজস্ব উৎস ব্যবহার করে আরও তথ্য সংগ্রহ করবে এবং শীর্ষ অর্থ পাচারকারীদের একটি তালিকা তৈরি করবে।
অবশেষে, এই তালিকা ব্যবহার করে বিএফআইইউ এগমন্ট গ্রুপের (মানি লন্ডারিং বিষয়ক তথ্য আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারকারীদের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করবে। টাস্কফোর্স এই পদ্ধতিতে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।
বিএফআইইউ তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করে একটি ডাটাবেজ তৈরি করেছে, যেখানে দেশ থেকে পাচার করা টাকা, সম্পদের বিবরণ এবং বিদেশে কার কোথায় কি ধরনের সম্পদ আছে তা রেকর্ড করা হয়েছে। এই তথ্য সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা সূত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিএফআইইউ এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠিয়ে আরও তথ্য চেয়েছে। এই চিঠিতে ১৪ জন প্রাক্তন মন্ত্রী, ১৬ জন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন কোম্পানির বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই কোম্পানিগুলির মধ্যে রয়েছে সাইফুল আলম মাসুদের এস আলম গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ, নাফিজ সরাফাত এবং আজিজ খানের সামিট গ্রুপসহ আরও কিছু কোম্পানি। বিদায়ী সরকারের ঘনিষ্ঠ আরও একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নামে থাকা বিদেশি সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পাচার করা টাকা, সম্পদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে এবং দেশে-বিদেশে তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হবে।
পাচার করা টাকা, সম্পদ উদ্ধারের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিদ্যমান আইনি বাধা চিহ্নিত করে তা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও, বিদেশ থেকে উদ্ধার করা সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং একটি কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা অন্যান্য দেশের অনুসরণে করা হবে।
পাচার করা টাকা উদ্ধারে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
টাস্কফোর্সে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি যুক্ত করে সদস্য সংখ্যা ৯ জন থেকে ১০ জনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাচার ঠেকাতে তদারকি বাড়ানোর সাথে সাথে এই কাজে যুক্ত সকল সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পাচার করা সম্পদ ফেরত আনা অনেকটা নির্ভর করে যে দেশে সম্পদ পাচার হয়েছে সেই দেশের মনোভাবের ওপর। যে দেশ থেকে অর্থ পাচার করা হয়েছে, সে দেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো থাকলে সাধারণ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক বা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে পাচার করা সম্পদের তথ্য চাওয়া হয় এবং সে দেশ তা বুঝতে পারে, তাহলে তারা তথ্য দেয় না এবং পাচার করা সম্পদ ফেরত আনতে কোনো সহযোগিতা করে না।
এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব ব্যক্তির পাচার করা সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছিল, অনেক দেশ সেই তথ্য দেয়নি। তারা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের শর্ত দিয়েছিল, যা বাংলাদেশ তখন পূরণ করতে পারেনি।
বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হলেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি রয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘের কাছে পাচার করা সম্পদ ফেরত আনার ক্ষেত্রে সহায়তা কামনা করেছেন এবং তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, এই সরকারের প্রধান কাজ হবে ড. ইউনূসের খ্যাতি ব্যবহার করে যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে সেসব দেশের সরকারকে অর্থ জব্দ করতে প্রভাবিত করা। এটি সফল হলে পাচারকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠানো সম্ভব হবে।
এই লক্ষ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলি দ্রুত এবং জোরালোভাবে নেওয়া প্রয়োজন, যাতে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল অর্জন করা যায়। পাচার করা টাকা যে দেশেই থাকুক না কেন, তা জব্দ করে বাংলাদেশ সরকারের জিম্মায় নিতে হবে। সম্পদ যে দেশে আছে সেখানেই থাকতে পারে, তবে তা থেকে প্রাপ্ত সুবিধা বাংলাদেশের জনগণ ভোগ করবে।
এদিকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে যুক্তরাজ্যে ২৫ কোটি ডলার মূল্যের ৩৬০টির বেশি বিলাসবহুল সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়ও তার সম্পদ ও ব্যবসা রয়েছে। এসব সম্পদ জব্দ করার জন্য যুক্তরাজ্যের অপরাধ তদন্ত সংস্থার কাছে চিঠি দিয়েছেন দেশটির বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক এমপি। বিষয়টি নিয়ে দেশটিতে তুমুল আলোচনা চলছে।
এদিকে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থ পাচার বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।