সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কর্ণফুলী টানেলে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, লাভের মুখ দেখছে না মেগা প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল লাভের মুখ দেখছে না। বরং আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় এটি এখন ঘাড়ের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্ণফুলী টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা প্রত্যাশার অনেক নিচে থাকায় আয় কম হচ্ছে। অথচ রক্ষণাবেক্ষণ খরচসহ চীনের ঋণ শোধের বিশাল অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের আগে পরিচালিত জরিপে দৈনিক ২০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের কথা বলা হলেও বর্তমানে গড়ে দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। ফলে দৈনিক আয় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। অথচ দৈনিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচই সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। এর বাইরে চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, “টানেলের উপযোগী সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। পরিবহন ব্যবস্থা না করেই টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হলে এর পাশে নানা ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। আর এসব কারখানার পণ্যবাহী যানবাহন কর্ণফুলী টানেলের ভেতর দিয়ে চলাচল করবে। যদি তা না হয়, কর্ণফুলী টানেল অব্যবহৃত থেকে যাবে।”

শুধু কর্ণফুলী টানেলই নয়, ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা রেল প্রকল্প নিয়েও লাভজনক হওয়ার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মা রেল প্রকল্প: ৩৯ হাজার কোটির বিনিয়োগ, লাভের মুখ দেখছে না

সড়ক যোগাযোগে পদ্মা সেতু বিপ্লব ঘটালেও, ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পটি লাভের মুখ দেখছে না। সহজলভ্য বাস, তুলনামূলক বেশি ভাড়া এবং সময়মতো ট্রেন না ছাড়ার মতো কারণে যাত্রীরা ট্রেনের চেয়ে বাসকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে রেলওয়ে লোকসান গুনছে।

প্রকল্পটিতে দৈনিক ২৪ জোড়া অর্থাৎ ৪৮টি যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচলের কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১০টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলছে। মালবাহী ট্রেন চলাচল এখনো শুরুই হয়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান বলেন, “রেলের অনেক প্রকল্পই নেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। জনগণের কতটা লাভ হবে, অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্পটি কতটা সফল হবে, তা চিন্তা করা হয়নি। ফলে এত বড় বিনিয়োগ করেও অর্থনীতিতে এর কোনো ভূমিকা নেই।”

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র: জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা

জ্বালানির নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত না করেই ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কয়লা আমদানি অনিশ্চিত হওয়ায় এর উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুই ইউনিটের একটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে থাকলেও গড় উৎপাদন ৯০০ মেগাওয়াট। প্রকল্প পরিচালকের দুর্নীতির কারণে কয়লা আমদানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আগস্টের পর আর কয়লা আমদানি হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সম্প্রতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিদর্শন করে একে ‘প্রকল্প বিলাস’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সাধারণ মানুষ খুব বেশি উপকৃত হচ্ছে না। গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প-কারখানা, রেল ও সড়ক সংযোগ না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে।”

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ: যাত্রী কমে লোকসান গুনছে রেল

১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে প্রত্যাশিত সংখ্যায় যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। গত ডিসেম্বরে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ১০ মাসেও আশানুরূপ ফল মেলেনি। দৈনিক ২৬টি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে চলছে মাত্র ৬টি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “ট্রান্স এশিয়ান রেল যোগাযোগের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও এটি অবাস্তব। মায়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তের অংশ পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড় ভেদ করে মায়ানমারের মূল অংশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ অবাস্তব স্বপ্ন।”

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্প-কারখানা চালু হলে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে আয় বাড়বে। তবে এজন্য সময় লাগবে।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “প্রকল্পগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। প্রকল্প শেষ হলেও এলাকাগুলোতে এখনো তেমন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি।”

পাঠকপ্রিয়