দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থপাচারের ঘটনাগুলি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, বিশেষ করে বিশিষ্ট শিল্পপতি এস আলম এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এই দুই ব্যক্তির দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সরকার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার একটি দৃঢ় উদ্যোগ নিয়েছে।
বিএফআইইউ-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা বিদেশে পাচার হওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং দেশের উচ্চ আদালত থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। দেশের সম্পদ বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি বিদেশেও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি ফার্ম নিয়োগ দেয়া হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এস আলম এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সম্পদের ওপর ভিত্তি করে এ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, দেশের আদালতের নির্দেশনার আলোকে বাজেয়াপ্ত প্রক্রিয়াটি শুরু হবে। বিদেশে সম্পদ বাজেয়াপ্তের জন্যে নিয়োগ করা হবে একটি বিশেষ ফার্ম, যারা আন্তর্জাতিক মানের আইনগত সহায়তা প্রদান করবে।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মানিলন্ডারিং ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) থেকে জানা যায়, সাইফুল আলম, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আহসানুল আলম ও আশরাফুল আলম সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করেছেন। এই অর্থ দিয়ে তারা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ কিনেছেন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ হচ্ছে, তারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পাচার করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরে ২৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া ভুয়া নথি তৈরি, জালিয়াতি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পণ্য আমদানি-রফতানি ও বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছে বলে আমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে। আমরা এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি এবং এর অংশ হিসেবে তাদের দেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কাজ শুরু হয়েছে।”
সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সম্পদের খোঁজ
অপরদিকে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যগুলোও সমানভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, তার পাঁচটি দেশে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যেই রয়েছে ৩৬০টি বাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে ৯টি বাড়ি। ব্যক্তিগত ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করে তিনি এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, “সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যগুলোও খুবই গুরুতর। আমরা তার বিদেশি সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং এ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে যাচ্ছি, যাতে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়।”
নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধেও অর্থপাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। তিনি তার চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন, যার বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। এসব অর্থ মূলত দুবাই, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, “এস আলমসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের বড় অংশই পাচার হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছি এবং এ ধরনের অর্থপাচার প্রতিরোধে সরকারের কঠোর মনোভাব রয়েছে।”

বর্তমান সরকার পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সটি দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও লজিস্টিক সহায়তা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এ বিষয়ে বলেন, “আমরা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে আমরা বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং শিগগিরই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
এছাড়া দেশে থাকা পাচারকারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দ্রুত জব্দ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। গভর্নর আরও উল্লেখ করেন, “যারা পাচারকারীদের সম্পদ কিনবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। কারণ এসব সম্পদ মূলত অবৈধভাবে অর্জিত।”
সরকারের লক্ষ্য হলো, অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা। এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী, নাসা গ্রুপসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দেশের উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপগুলি দ্রুত কার্যকর করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।