সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কোথায় গিয়েছে সিএসআর খাতের কোটি কোটি টাকা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের অর্থ মূলত দেশের বঞ্চিত ও অনগ্রসর মানুষের সামাজিক এবং শিক্ষামূলক উন্নয়নে ব্যয় করার কথা। কিন্তু গত দেড় দশকে সিএসআরের বড় একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

যেকোনো বিপর্যয়, দুর্যোগ বা জাতীয় উপলক্ষে ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে এই অর্থ জমা দিয়ে আসতেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অর্থ গ্রহণ করতেন, যা দিয়ে বিভিন্ন সময় তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে মোট সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। এই অর্থ দিয়ে মুজিব বর্ষ উদযাপন, শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ, শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের জন্ম-মৃত্যু দিবস পালনের মতো আয়োজন করা হয়েছে।

বিশেষ করে মুজিব বর্ষ উদযাপনে ২২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে, যা দেশের সাধারণ জনগণের উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয়ের কথা থাকলেও তা সুনির্দিষ্টভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে কেন্দ্র করেই ব্যয় হয়েছে।

সিএসআর এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার, যা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি নির্ধারিত কাঠামো। সিএসআর-এর মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান অসমতা, দারিদ্র্য ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকগুলোর জন্য সিএসআরের অর্থ ব্যয়ের দিকনির্দেশনা দেয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যে, ২০ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় করবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সিএসআর খাতে শিক্ষায় মাত্র ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যেখানে তা ৩০ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যে ৩১ দশমিক ২৬ শতাংশ ব্যয় হলেও পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। অথচ অন্যান্য খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ব্যয়ের নির্দেশনা থাকলেও সেখানে ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে, যা প্রধানত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে।

বিএবি (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস) নিয়মিতভাবে সিএসআর খাতের অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দিত। বিশেষ করে শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য এই অর্থের একটি বড় অংশ জমা দেওয়া হতো। তবে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জমা দেওয়া অর্থে কতগুলো কম্বল কেনা হয়েছে, সেই কম্বলগুলো কোথায় বিতরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া কম্বলের পরিমাণ হতে পারে প্রায় চার কোটি পিস। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম্বল না দিয়ে সরাসরি টাকার চেক জমা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার, যিনি টানা ১৭ বছর ধরে সংগঠনটি পরিচালনা করেছেন, সম্প্রতি গ্রেফতার হন। তিনি এক্সিম ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। তার সময়ে বিএবি সিএসআর তহবিলের অর্থ জমা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। তবে বর্তমান নেতৃত্ব সেই প্রক্রিয়াকে চাঁদাবাজি হিসেবে অভিহিত করেছে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বিএবির বর্তমান নির্বাহী কমিটির সদস্য এ কে আজাদ বলেন, “এতদিন বিএবির মাধ্যমে যা হয়েছে, তা কেবলই চাঁদাবাজি। সংগঠনটি সাবেক চেয়ারম্যানের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। টাকা চাইলেই দিতে হতো, এমনকি টাকার অংকও নির্ধারণ করে দেওয়া হতো।”

নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকগুলো সিএসআরের অর্থ ব্যয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে উল্লেখ করে এ কে আজাদ আরও বলেন, “আমরা এখন সিএসআরের অর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য ব্যয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কল্যাণেও এ অর্থ ব্যয় করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সিএসআরের অর্থ যেন আসল উদ্দেশ্যে খরচ হয়, সে জন্য নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।”

বিএবির বর্তমান জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, যিনি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন, বলেন, “সিএসআর হলো জাকাতের মতো, যা সম্পদ নিচের দিকে স্থানান্তরিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে সিএসআরের অর্থ যেভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তা অনেকাংশে লোক দেখানো। ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত সাদকা ফান্ডের মাধ্যমে দেশে ১৯টি হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে দরিদ্র মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। আমি মনে করি, সিএসআরের অর্থ প্রত্যেকটি ব্যাংকের শাখার আশপাশে সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।”

মুজিব বর্ষ উদযাপন, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ জমা দেওয়ার মাধ্যমে সিএসআরের অর্থের অপব্যবহার নিয়ে দেশের সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সিএসআরের অর্থ সঠিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয় করা হতো, তাহলে দেশের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এর প্রভাব আরও কার্যকর হতে পারত।

সিএসআরের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন। কিন্তু রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে এই অর্থের অপব্যবহারের ফলে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

পাঠকপ্রিয়