চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার (২২) মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে আছে তার পরিবার। গত ১৮ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলি এসে বিদ্ধ হয় হৃদয়ের গলায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৩ জুলাই মঙ্গলবার না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।
মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঘটকের আন্দুয়া গ্রামের কাঠমিস্ত্রি রতন চন্দ্র তরুয়া ও অর্চনা রানীর দুই সন্তানের মধ্যে ছোট ছিলেন হৃদয়। অভাব-অনটনের সংসারে ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন বাবা-মা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী হৃদয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন তারা।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে বাবা-মায়ের সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ছেলের অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন রতন তরুয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার আদরের ধন হৃদয় অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছিল। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত। স্বপ্ন দেখিয়েছিল, বিসিএস ক্যাডার হয়ে সংসারের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচাবে। কিন্তু হায়, সব শেষ হয়ে গেল!”
হৃদয়ের বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া আরও বলেন, “ছেলেকে নিয়ে আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার নিমেষেই ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে। দেশের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল আমার হৃদয়, এটা কি অপরাধ?
হৃদয়ের বড় বোন মিতু রাণী জানান, “ভাইয়ের কাছে খুব বেশি টাকা পাঠাতে পারতেন না। ছেলে একদিন বড় হবে, চাকরি করবে, পরিবারের দুঃখ ঘুচবে, সেই আশায় ছিলেন বাবা-মা। বাবাকে ফোন করলেই বলতো, ‘বাবা আর কয়েকটা বছর। তারপর আর কষ্ট করতে হবে না।’”
হৃদয়ের মৃত্যুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিচার চেয়েছেন বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া। তিনি বলেন, “হৃদয়সহ যাদেরকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে, সেই স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশসহ দলীয় নেতাকর্মী যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত তাদের যেন বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়।”
আজ ছেলের শ্মশানের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই অসহায় এই বাবার। শোকে পাথর রতন তরুয়ার এখন একটাই চাওয়া, “হৃদয় তরুয়াসহ যারা রক্ত দিয়ে নতুন স্বাধীনতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে জাতি যেন তাদের এই আত্মদান কখনো ভুলে না যায়, তাদের যেন যথাযথ সম্মান জানানো হয়। তাদের পরিবারের প্রতি সরকার যেন সহানুভূতিশীল হয়।”