সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পাহাড়, নদী ও বনখেকোদের হাত থেকে কক্সবাজারকে বাঁচাবে কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, ঢেউয়ের গর্জন, বালিময় সৈকত, কাঁকড়ার ছোটাছুটি, পাখির কলতান, ঝর্ণার শব্দ, আর সবুজ বন-পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি—সব মিলিয়ে কক্সবাজার যেন প্রকৃতির এক অপরূপ ক্যানভাস। কিন্তু সেই ক্যানভাসে এখন শুধুই ধ্বংসের ছবি। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী দখল ও দূষণে কক্সবাজার তার আপন সত্তা হারাতে বসেছে। স্কেভেটর আর কোদালের আঘাতে পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, নদীগুলো পরিণত হয়েছে মৃতপ্রায় খালে।

পাহাড়খেকোদের তাণ্ডব: চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী

চকরিয়ার বিস্তৃত বনভূমি এখন প্রায় বৃক্ষশূন্য। বন বিভাগের শতাধিক পাহাড় কেটে বালি ও মাটি বিক্রি করে দিয়েছে ভূমিদস্যুরা। ১২টি বনবিটের আওতায় এমন কোনো পাহাড় নেই যেখানে তাদের থাবা পড়েনি। দশ হাজারের বেশি কাঁচা-পাকা স্থাপনা, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পাহাড় কেটে। বন বিভাগ দায়সারাভাবে কিছু মামলা করলেও প্রভাবশালী বনখেকোরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। লোকবল সংকট, প্রভাবশালীদের চাপ, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র বনদস্যুদের কারণে বনরক্ষায় বন বিভাগ অসহায় হয়ে পড়েছে।

চকরিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘সুন্দরবন’ও তার সৌন্দর্য হারিয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে এখন শুধুই মৎস্য ঘের আর লবণ মাঠ। ২০০০ সালেও এখানে সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ থাকলেও এখন টিকে আছে কেবল বাইন, কেওড়া ও কিছু গোলপাতা। মৎস্য ঘেরের নামে চলছে দখলদারদের উৎসব। সুন্দরবন রেঞ্জের ৮ হাজার ২৩ দশমিক ৩১ একর ভূমি জবরদখলে রয়েছে। উচ্ছেদ মামলা হলেও কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে না।

মহেশখালীর উপকূল জুড়ে থাকা ঘন প্যারাবনও আজ বিপন্ন। নির্বিচারে বাইন গাছ কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে, কমে গেছে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। পেকুয়াতেও পাহাড় দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। পাহাড়ের চূড়ায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে হাজারো মানুষ। এতে পাহাড় ধ্বংসের পাশাপাশি বাড়ছে ভূমিধস ও প্রাণহানির শঙ্কা।

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় বাঁকখালী, পিলটকাটা, ভোলা নদী

কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাঁকখালী নদী এখন দখল-দূষণের শিকার। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা। ২৮টি অবৈধ জেটি, বালি ও পাথর বিক্রির সেল সেন্টার, তেলের বার্জ, বরফকল, কোল্ড স্টোরেজ, ফিশিং অফিস, ডকইয়ার্ড, মাছ ও শুঁটকির আড়তসহ অসংখ্য বসতঘর নদীটিকে গ্রাস করেছে।

দ্বীপকন্যা কুতুবদিয়ার পিলটকাটা খালও অস্তিত্ব সংকটে। অবৈধ দখল, দূষণ ও পলি জমে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয়রা দ্রুত খালটি পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তিন বছর আগে খালটি পুনঃখননের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠালেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

মাতামুহুরী এবং পেকুয়ার পাহাড়ি ছোট ছোট নদী থেকে উৎপন্ন খরস্রোতা ভোলা খালও ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাচ্ছে। খালের বিভিন্ন অংশে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মৎস্য ঘের, বসতভিটা ও দোকানপাট।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মঈনুল হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, পাহাড়ের চূড়ায় ঝুঁকিতে বসবাসকারী এবং বনের জায়গায় অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে, কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায়, অচিরেই এই অপরূপ পর্যটন কেন্দ্রটি তার সকল আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।

পাঠকপ্রিয়