মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

অবৈধ মসলার বাজার: সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, ঝুঁকিতে বৈধ ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) প্রতিবেদনে মসলা ও শুকনো ফল চোরাচালানের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চিহ্নিত ১৭ জন চোরাকারবারি কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে আন্ডার ইনভয়েসিং, ওজনে কারচুপি এবং লাগেজ সুবিধার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ মসলা ও শুকনো ফল অবৈধভাবে দেশে আনছে। এতে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন।

এসবি’র গোপন প্রতিবেদনে চোরাচালানের সাথে জড়িত ১৭ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হলেন – সিরাজুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর, ওয়াদুদ মাস্টার, নূর মোহাম্মদ, মো. আসাদুল, দিদার হোসেন ওরফে দিলু মিয়া, জাহাঙ্গীর ওরফে কালা জাহাঙ্গীর, সুরুজ মল্লিক, শাহ আলম, হুরমুজ, নূরনবী কাউন্সিলর, রোকন গাজী, আবু তালেব, মো. বাবু মিয়া, মো. তারাজুল ইসলাম, কামরুল আহমেদ ও মুন্না আহমেদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আখাউড়া, ছাগলনাইয়া, চৌদ্দগ্রাম, হালুয়াঘাট, বগুড়া, সাতক্ষীরা ও খুলনা সীমান্ত দিয়ে এসব মসলা আনা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি টহলের ঘাটতিকে চোরাচালান বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে চোরাচালানের বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, ওজনে কারচুপি এবং লাগেজ সুবিধার অপব্যবহার করে কীভাবে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানিকারকরা বেশি দামের পণ্য এনে কম দাম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেন। কাস্টমস কর্মকর্তাদের একাংশ এতে সহযোগিতা করে। স্থলবন্দরে ওজনে কারচুপির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। স্বয়ংক্রিয় ওজন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বন্দরে এটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তি বছরে একাধিকবার ভারত ভ্রমণের সময় লাগেজে করে ৮-১০ কেজি পর্যন্ত মসলা নিয়ে আসেন, যদিও নিয়ম অনুযায়ী ২ কেজির বেশি আনার অনুমতি নেই। কাস্টমস কর্মকর্তাদের একাংশের সহায়তায় তারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব মসলা দেশে আনেন।

চোরাচালান বন্ধে এসবি’র প্রতিবেদনে ৮ দফা সুপারিশ করা হয়েছে:

১. মসলা ও শুকনো ফলের আমদানি শুল্ক কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ।
২. স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণা ও আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. মসলার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ।
৪. সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিজিবির টহল বৃদ্ধি।
৫. সকল স্থলবন্দরে স্বয়ংক্রিয় ওজন ব্যবস্থা চালু।
৬. সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা।
৭. গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধি।
৮. সীমান্ত এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনগণকে চোরাচালান প্রতিরোধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।

জানুয়ারি মাসে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনেও মসলা ও শুকনো ফলের চাহিদা ও আমদানির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। এতে বলা হয়, চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হলেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি নেই। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এসব পণ্য চোরাচালান বা মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে দেশে আসছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নয়টি মসলা ও শুকনো ফলের বার্ষিক চাহিদা ১ লাখ ২৪ হাজার টন। গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার টন। ঘাটতি ৫৬ হাজার টন, যা অবৈধ পথে বাজারে প্রবেশ করেছে। এই অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে আসা পণ্যের খুচরা মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, মসলা আমদানিতে উচ্চ শুল্ক হার প্রযোজ্য। প্রতি কেজি জিরায় ২৫১ টাকা, দারুচিনিতে ১২২ টাকা, এলাচিতে ৫৩৫ টাকা, লবঙ্গে ২৮৫ টাকা, কিশমিশে ২৮৯ টাকা, কাঠবাদামে ৩১০ টাকা, পেস্তাবাদামে ৬১৯ টাকা, আলুবোখারায় ১৫৪ টাকা এবং কাজুবাদামে ৪৪৫ টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে, মসলা ও শুকনো ফলের চোরাচালান রোধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

পাঠকপ্রিয়